অভদ্রতা আর পশুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা

যাহারা অন্যকে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজের প্রত্যায়নপত্র দেয়, তাহাদের দেশে এমন ঘটনা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষদের স্তম্ভিত করিয়াছে। বলছিলাম গত ২৪ মে ২০২২ ইং তারিখে টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে বর্বর বন্দুক হামলার কথা। যে বন্দুক হামলায় ১৯ জন শিশু শিক্ষার্থীসহ ২১ জন মারা গিয়েছে। এখানে সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় এই যে, এমন মর্মান্তিক দুঃখজনক ঘটনা আমেরিকায় প্রায় প্রতিদিনেই ঘটছে।

টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে বন্দুক হামলায় যেদিন ২১ জন মারা গেল, সেদিন দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির একটি প্রাইমারী স্কুলেও ঘটেছিল আরেকটি পৃথক হামলা। তাতে আহত হয় তিন জন শিশু। তার আগের দিন সোমবার অর্থাৎ ২৩ মে পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরের একটি হাইস্কুলে গোলাগুলির ঘটনায় আহত হয়েছিল তিন কিশোর। এই ঘটনাগুলো ছোট পরিসরে ঘটায় মানুষের নজরে আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় তাদের মধ্যকার সব দ্বন্দ্ব গোলাগুলির পর্যায়ে গিয়ে শেষ হচ্ছে। চলতি বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালের শুরু থেকে ২৪ মে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১৩৭টি স্কুলে গোলাগুলি হয়েছে। হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে প্রায় প্রত্যেক দিনেই দেশটির কোন না কোনো স্কুলে গোলাগুলি হয়েছে।

এককথায় যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঝুকি যেভাবে বাড়ছে, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমনটি দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল শিক্ষার্থীরা এ্যাক্টিভ শুটার ড্রিল অনুশীলন করছে। এ্যাক্টিভ শুটার ড্রিল হল একপ্রকারের আত্মরক্ষার কৌশল। স্কুলগুলোতে বন্দুকধারীদের হামলা হলে শ্রেণিকক্ষের লাইট বন্ধ করে ও প্রবেশপথ আটকে দিয়ে কিভাবে লুকিয়ে থাকতে হবে, তা শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় এ্যাক্টিভ শুটার ড্রিলে। গোলাগুলির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় স্কুলগুলোর নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি শিল্পও গড়ে ওঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বহু স্কুলে বুলেট প্রুফ দরজা-জানালা ব্যবহার করা হয়েছে। বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর। বহু স্কুলেই সশস্ত্ররক্ষী ভাড়া করে পাহারা আরো জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না বন্দুক হামলা।

কিন্তু কেন? কী করে বন্দুক হামলাগুলো কমিয়ে আনা সম্ভব? বন্দুক হামলা সম্পর্কে রাষ্ট্রের কী-ই বা করা উচিত? প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, শাস্তি কোনকিছু দিয়েই ঠেকানো যাচ্ছে না বন্দুক হামলা।
কিন্তু কেন বন্দুক হামলার সংখ্যা এতো বৃদ্ধি পাচ্ছে? কী করলে কমবে এ জঘন্য অপরাধ? মাথামোটা জাতি মার্কিনীরা যে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজছে না তা নয়।

টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে বন্দুক হামলায় নিহত শিশুরা। ছবিঃ সংগৃহীত

টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে বন্দুক হামলাকারী খুনি নিজেও একজন শিশু। বয়স ১৭ কি ১৮ হবে। সাধারণত এই বয়সের ছেলেমেয়েরা হয় লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আর নাহয় প্রেমিক-প্রেমিকাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু হামলাকারী এসবে মোটেও অভ্যস্ত নয়। সে ছোটবেলা থেকেই ফ্রী ফায়ার ও পাবজি গেইম নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তার মাথায় সবসময় একটাই চিন্তা ছিল, কিভাবে গেইমের বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো যায়! ফ্রী ফায়ার ও পাবজি গেইমের মতো বাস্তবে কিভাবে একা অনেক মানুষকে শুট করা যায়? আর করলোও তাই!

১৭/১৮ বছরের ছেলে এমন ভয়ংকর অস্ত্র পেলো কোথায়?

হামলাকারী তার ১৮তম জন্মদিনে সে নিজেই কিনেছে অস্ত্রটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, বয়স ১৮ বছরের নিচে কেউ সিগারেট কিনতে পারবে না। ২১ বছরের নিচে কেউ মদ কিনতে পারবে না। কিন্ত অস্ত্র বিক্রির আইন এতোটাই সহজ যে, নিরাপত্তার স্বার্থে বা আত্মরক্ষার জন্য যেকেউ অস্ত্র কিনতে পারে।

এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, অস্ত্র হাতে পেলেই কি ঝাপিয়ে পরতে হবে সাধারণ মানুষের ওপর? নিজের মেজাজ খারাপ হলেই কি মানুষ মেরে ফেলতে হবে? ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের ওপর ঝাপিয়ে পরতে হবে? কেন হচ্ছে একই ঘটনা বারবার? কেন ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের জীবন নিয়ে হুলি খেলছে?

প্রশ্ন আসতে পারে, অস্ত্র হাতে পাওয়ার সহজলভ্য হ্রাস করে অস্ত্র বিক্রির আইনে কঠোরভাবে লাগাম টানা যায়না?
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য বিষয়টা প্রায় অসম্ভব। তারা জন্মগতভাবেই স্বাধীনতা প্রিয় একটি জাতি। রাষ্ট্র জোর করে তাদের ওপর কোনকিছু চাপিয়ে দিলেই তারা খুশি হয়ে সেটা মেনে নেবেনা। আমেরিকানদের জন্য বিষয়টা এতো সহজ নয়। তারা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে অস্ত্রের পিছনে। অস্ত্রকে তারা ট্রিট করে পরিবারের সদস্যদের মতই। কাজেই রাষ্ট্র যেমন খুশি তেমন একটি আইন তাদের ওপর চাপিয়ে দিবে, আর তারা তা খুশি হয়ে মেনে নিবে এমন একটি বোকা জাতি তারা নয়।

টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে বন্দুক হামলাকারী শিশু সন্ত্রাসী সালবাদোর রামোস। ছবিঃ সংগৃহীত

যখনই আমেরিকার স্কুলগুলোতে বড়সড় কোনো বন্দুক হামলা হয়, তখন সবাই অবাধে অস্ত্র বিক্রির ওপর আঙুল তুলে। হয়তোবা অস্ত্রের সহজলভ্যতা এরকম ঘটনার প্রধান কারণ হতে পারে। কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। এরকম ঘটনা বার বার ঘটার পিছনে আরোও কিছু কারণ রয়েছে।
আমার মতে, পরিবারহীনতা, মা-বাবার উদাসীনতা ও গেইম এডিকশন এই ধরনের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তির কারণ।

পরিবারহীনতা: আমেরিকান পরিবারের শিশুরা পরিবারহীন শৈশব কাটায়। এর প্রধান কারণ হল: মা-বাবার কয়েকদিন পরপর বিবাহ বিচ্ছেদ। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে চিনা পৃথিবীটা হঠাৎ একদিন তাদের কাছে অচেনা হয়ে যায়। মা বাবার বিচ্ছেদের পর কেউ থাকে মায়ের কাছে, কেউ থাকে বাবার কাছে। নতুন পরিবেশে তারা অবহেলার শিকার হতে থাকে।
একটি সুস্থ্য পরিবার পারে একজন শিশুকে মানবিক গুন সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টের জগত উঠেপরে লেগেছে পরিবার বিচ্ছিন্নতার দিকে। ওরা রাত দিন পারিবারিক দ্বন্দের কুতসিত কলহর যে দৃশ্য দেখায় তাতে যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে ছোট ছোট পরিবার হয়। যারফলে শিশুদের ওপর বিরাট মানসিক প্রভাব পড়ে।

টেক্সাসের এলেমেন্টারি স্কুলে হামলায় নিহতের স্বজনদের কান্না। ছবিঃ সংগৃহীত

মা-বাবার উদাসীনতা: মা-বাবার ভালোবাসা এবং অসহায়ত্ব শিশুদের কিভাবে প্রভাবিত করে, তা আমেরিকানদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। মহা আধুনিক এই যুগের মানুষেরা রোবটের মতো মায়াদয়াহীন হৃদয়হীন হয়ে উঠেছে। নিজের ভালোর জন্য পৃথিবীতে যাদের আনা হলো, তাদের জন্য কোনো দায়বদ্ধতা নেই মা-বাবার। সন্তানের হতাশা, দুঃখ, কষ্ট ও সুপ্ত বেদনার কোনো মূল্য নেই মা-বাবার কাছে। এজন্যই একাকী শিশুরা হতাশার ভার সইতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পরছে। কারও হাসিমুখে থাকাটা সহ্য করতে পারছে না তারা।

গেইম এডিকশন: গেইম এডিকশন নিয়ে আমি অনেক আগ থেকেই সোচ্চার। মা-বাবা নিজেরা শিশুদের সময় না দিয়ে গেইমের যে পথ শিশুদের দেখিয়ে দিচ্ছে, তা থেকে খুব সহজেই ফিরতে পারছেনা শিশুরা। ফ্রী ফায়ার ও পাবজির মতো গেইমে গোলাগুলি, খুনাখুনি করে সময় কাটাচ্ছে তারা। গেইমের মাঝে গোলাগুলি ও খুনাখুনি করতে করতে মানবিকতা, ভালোবাসা, আদর-স্নেহ সবকিছুই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সবাইকে শত্রু মনে করে, তাই সবাইকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। ফ্রী ফায়ার ও পাবজির মতো গেমগুলো এভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এককথায় বলতে গেলে, ফ্রী ফায়ার ও পাবজির মতো গেইমগুলো বন্দুক হামলা শিখানোর প্রশিক্ষণ সেন্টার হিসেবে কাজ করছে।
সবাই খেলছে, কাজেই আমার ছেলেমেয়ে খেললে সমস্যা কোথায়? এসব কুযুক্তি না দিয়ে গেইম এডিকশন থেকে বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে। সময়ের সুষম বণ্টন শিখাতে হবে বাচ্চাদের।

ধুমপান ও মাদকদ্রব্যের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতটা প্রতিক্রিয়া দেখায়, প্রাণঘাতী অস্ত্রের বেলায় ততটা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনা কেন? তারা কি জানেনা, কেবল সুস্থ্য একটি পরিবার পারে একটি শিশুকে মানবিক গুণসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে? তাই পারিবারিক মুল্যবোধ, ফ্রী ফায়ার ও পাবজির মতো ভিডিও গেমের কু-প্রভাব, সামাজিক অবক্ষয় এসবের পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে বন্দুক হামলার ঘটনা ইতি টানতে অস্ত্র আইনের আশু পরিবর্তন প্রয়োজন। যে আইন একটা ১৮ বছরের ছেলের হাতে বন্দুক তুলে দিতে পারে, সেটা আর যাই হোক, কোন সভ্য দেশের আইন হতে পারে না। রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা থাকলে এই আইন যেকোনো সময়ে পরিবর্তন করা যায়। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। একটা ঘটনাতেই সেটা করে দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু হাজারটা ঘটনা ঘটার পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথামোটারা করে দেখাতে পারেনা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে অস্ত্রের গুরুত্বটা অনেক বেশি, এতগুলো শিশুর জীবন তাদের কাছে কিছুই না।
অন্যকে প্রেসক্রিপশন দেয়া যতট সহজ কিন্তু সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিজ দেশ পরিচালনা করা ততটা কঠিন, এইটা মাথামোটা জাতি মার্কিনীরা টিকই বুঝে।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সোচ্চারের পাশাপাশি দরকার তাদের একটা সুন্দর শৈশব দেয়া, পরিবার দেয়া, নিরাপত্তা দেয়া, স্নেহ-ভালোবাসা দেয়া। সেটা কি খুব কঠিন? মোটেও কঠিন নয় মার্কিনীদের কাছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের উচিত শিশুদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসা।

2 thoughts on “অভদ্রতা আর পশুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা”

  1. আপনার বিশ্লেষণের সাথে একমত। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে এমন নির্মম নৃশংসতা মেনে নেয়া যায় না। খবরটা শুনে যে-কেউ চমকে উঠবে নিঃসন্দেহে।

    ‘সন্ত্রাসী’দের পরিচয় জানা গেছে? ওরা তো আবার ‘সন্ত্রাসী’র ডেফিনিশনে পড়ে না, ওরা বন্দুকধারী।

    ব্যক্তিগত অস্ত্র বিক্রির নিয়মগুলো কঠোর করা উচিত। আমেরিকানদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কি খুবই হুমকির মুখে? নইলে অস্ত্র বিক্রি এত অবাধে হয় কীভাবে?

    Reply
  2. আমার মনে হয় আমেরিকানরা পশুর চেয়ে বেশি ভালো না

    Reply

Leave a Reply to সুর্যের আলো Cancel reply