আলেমরা চুপ থেকে কি বলৎকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে?

ইদানিং দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষক দ্বারা মাদ্রাসার-ই ছোট ছোট কোমলমতি ছাত্রদের বলৎকারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোট ছোট কোমলমতি ছাত্রদের বলৎকারের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে কয়েকজন মাদ্রাসার শিক্ষক (হুজুর) গ্রেফতার হয়েছে। দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্র বলৎকারের এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করছে পত্র-পত্রিকাগুলো।

আমরা কোন সভ্য দেশে বসবাস করছি? যে দেশে শিক্ষকরা ছোট ছোট কোমলমতি ছাত্রদের বলৎকার করে। তা-ও আবার হুজুর শিক্ষক। কোরআনে হাফেজ শিক্ষক। গত ২৩ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীর মারকাজুত তাহফিজ কওমী মাদ্রাসার দুই শিক্ষক দ্বারা ছাত্র বলৎকারের ঘটনাটি পত্রিকায় আসে। নিস্পাপ শিশু বলৎকারী মাওলানা হাফিজ আবু বকর ও মাওলানা হাফিজ আল আমিন সাহেব।

পূর্বে মাদ্রাসায় বলৎকারের ঘটনা নিয়ে আড়ালে আবডালে আলোচনা হলেও ইদানীং মাদ্রাসায় বলাৎকার সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন বিভিন্ন সংগঠন ও কর্তাব্যক্তিরা। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে একটি সংগঠন জানিয়েছে যে, গত ছয় মাসে ১৫০টি ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষকরা। মাদ্রাসা শিক্ষকের বলৎকারে এনাল ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেছে দুটি শিশু, আত্মহত্যা করেছে একজন।

ফেনীতে বলৎকারের অভিযোগে গ্রেফতার কোরেশমুন্সী দারুল কোরআন ওয়াস ছুন্নাহ্ মাদ্রাসার ৫৩ বছর বয়সী শিক্ষক মাওলানা শাহিনুর রহমান

ছাত্র বলৎকারের ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটছে হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও কওমী মাদ্রাসায়। অনেক কওমী মাদ্রাসা শিক্ষকেই বলে থাকেন যে, এ ধরণের বলৎকারের ঘটনা স্কুল কলেজেও ঘটে। কওমী শিক্ষকদের বক্তব্যটি মিথ্যা নয়। কিন্তু তারপরও কওমী শিক্ষকদের অবগতির জন্য বলছি, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা কওমী ছাত্রদের অভিভাবকদের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। আর তাছাড়া স্কুল পরিচালনা কমিটিও এই ধরণের ঘটনা ঘটলে ধামাচাপা দেবার পরিবর্তে দেশের প্রচলিত আইনে অর্থাৎ আদালতকেই বিচারের জন্য বেছে নেয়।

কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষকরা কিংবা মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি কোনো অবস্থাতেই বলৎকারের ঘটনাটি কাউকে জানতে বুঝতে দেন না। তারা বলৎকারের ঘটনাটি দামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন সব সময়। কারণ তারা চান না, সাধারণ মানুষের কাছে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হোক। এই ধরণের ঘটনা ঘটলে যতক্ষণ পর্যন্ত না নিপীড়িত ছাত্রের অভিভাবক আইনি পথে না হাঁটেন, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রায় সব সময়-ই বিষয়টি চেপে যাবার চেষ্টা করে বা দামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে কওমী মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি।

কিশোরগঞ্জে বলৎকারের অভিযোগে গ্রেফতার জা‌মিয়া আরা‌বিয়া দারুস সূন্নাহ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ৫৫ বছর বয়সী মাওলানা নুর মোহাম্মদ আজমী

প্রিয় পাঠকদের অবগতির জন্য নিম্নে গত জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বলৎকারের ঘটনা তুলে ধরছি:
গত ৫ জুলাই ২০২২ চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ১০ বছরের এক ছাত্রকে বলাৎকারের মামলায় বায়তুন নূর মোহাম্মদিয়া তালিমুল কোরআন মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত ১১ জুলাই ২০২২ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের কামারহাট জরিনা বেগম হাফিজিয়া মাদ্রাসার একাধিক ছাত্রের সাথে বলৎকারের অভিযোগে ছোটো হুজুর মাওলানা ওমর ফারুককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গত ২৭ জুলাই ২০২২ সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা সিদ্দিকিয়া কওমি মাদ্রাসার এক ছাত্রকে বলৎকারের অভিযোগে শিক্ষক হাফেজ মাওলানা মুছহাব বিল্লাহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত ২৮ জুলাই ২০২২ ফেনীর দাগনভূঞায় কেরোনীয়া তালিমুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া ১১ বছর বয়সী ঘুমন্ত ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসুমকে আটক করেছে পুলিশ

গত ২৯ জুলাই ২০২২ দিনাজপুরের সোনাপীর দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসার আবাসিক এক ছাত্রকে বলাৎকার করার অভিযোগে শিক্ষক হাফেজ মাওলানা মোঃ ওয়াক্কাস আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত ১৫ আগস্ট ২০২২ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় ১২ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে ৩৮ বছর বয়সী শিক্ষক আব্দুর রহিমকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

গত ১৬ আগস্ট ২০২২ ভোলার মনপুরায় একাধিক শিশু ছাত্রকে বলৎকারের ঘটনায় হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসার মুহতামিম ৩০ বছর বয়সী মাওলানা ইসমাইলকে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় জনতা। সে মাদ্রাসার ভিতরেই জামাতের সহিত শিশু বলৎকার করতো

গত ২২ আগস্ট ২০২২ লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে তাহযীবুল উম্মাহ ইসলামিক ইনস্টিটিউটের ২৭ বছর বয়সী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা শাহাদাৎ হোসেন ছাত্র বলৎকারের দোষ দিল শয়তানের ওপর। সে ছাত্রকে বলৎকারের কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে।

গত ২৮ আগস্ট ২০২২ নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় বলৎকার অভিযোগে তাজুল ইসলাম নামে এক কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে জনতা।

১২ সেপ্টেম্বর ২০২২
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় ছাত্র বলৎকারের অভিযোগে, বারাংকুলা এমদাদিয়া কাশেমউলুম কওমি মাদরাসার অধ্যক্ষ এবং দিঘিরপাড় জামে মসজিদদের ইমাম মাওলানা আরিফ বিল্লাহকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ গাজীপুর মহানগরীর মইনুল ইসলাম হামীউস সুন্নাহ মাদ্রাসার শিশু ছাত্রকে বলাৎকার অভিযোগে শিক্ষক মাওলানা আব্দুর রহমান ওরফে শান্ত ইসলামকে জনকে আটক করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ সিলেটের বিয়ানীবাজারে মাদ্রাসা ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে হযরত হায়দর শাহ (রহঃ) হাফিজিয়া মাদরাসার মুহতামিম ৫৫ বছর বয়সী হাফিজ মাওলানা আব্দুর রহিমকে আটক করেছে বিজিবি।

সিলেটের বিয়ানিবাজারে হযরত হায়দর শাহ (রহঃ) হাফিজিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসার ৫৫ বছর বয়সী অধ্যক্ষ হাফিজ মাওলানা আব্দুর রহিমকে আটক করেছে বিজিবি

গত ৩১ সেপ্টেম্বর ২০২২ পঞ্চগড়ের সদর উপজেলায় ১০ ও ১২ বছর বয়সি দুই ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে বাটুভিটা নুরানী এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষক ২৪ বছর বয়সী মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো সেই নিপীড়িত ছাত্রদের, যাদের অভিভাবকরা অধিক সচেতন। মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের জন্য আদালতে শরণাপন্ন হয়েছেন। যারফলে বলৎকারের উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো দেশের পত্রপত্রিকায় এসেছে।

শুধুমাত্র যে ঘটনাগুলো পত্রপত্রিকায় এসেছে সেগুলোই কিন্তু কওমি মাদ্রাসার ছাত্র বলৎকারের প্রকৃত চিত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে এরকম হাজার হাজার ঘটনা দেশের কওমি মাদ্রাসা ও মসজিদ-মক্তবে হচ্ছে।

গত রমজান মাসে বগুরায় গ্রেফতার পলাশবাড়ী উত্তরপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার ৩৮ বছর বয়সী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা ওমর ফারক

কওমি মাদ্রাসার ছাত্র বলাৎকারের ব্যাপারে অনেকেই আমাকে চুপ থাকতে বলেন। চুপ থাকার কারণ হিসেবে তারা বলেন যে, রোজ কিয়ামতের দিন সৃষ্টিকর্তা নাকি আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে করবেন। আর এজন্যই সাধারণ মানুষদের বলা হয় যে, আলেমদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে। এক শ্রেণির আলেমরা এই ফতোয়া দিয়ে মুলত কওমি মাদ্রাসায় ছাত্র বলৎকারের বিষয়টিকেই জায়েজ করে দিয়েছে। আর এজন্যই কওমি মাদ্রাসায় ছাত্র বলৎকারের ঘটনা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

বছর দুয়েক আগে আমাদের বাড়ির পাশেই হাফিজ মাওলানা হোসাইন আহমদ সাজো নামে এক ব্যক্তি নওয়াগাও হাফিজিয়া মাদ্রাসা গড়ে তুলেন। মাদ্রাসাটি চলছিলও বেশ। গত বছর হঠাৎ করেই মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে খবর নিয়ে জানতে পারলাম, হাফিজ মাওলানা হোসাইন আহমদ সাহেব মাদ্রাসার একজন ছাত্রকে বলৎকার করার কারণে স্থানীয় লোকজন হোসাইন আহমদ সাহেবকে গণধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে এবং মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে বলৎকারীকে শুধুমাত্র গণধোলাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়নি এবং এই ঘটনাটি দেশের কোনো পত্রপত্রিকায় আসেনি।

আমাদের বাহাদুরপুর গ্রামের মসজিদের বেশ কয়েকজন ইমাম সাহেবকে চাকরি হারাতে হয়েছে ছোট ছোট কোমলমতি বাচ্চাদের বলৎকারের অভিযোগে। কিন্তু ইমাম সাহেবরা বলৎকারের অভিযোগে শুধুমাত্র চাকরিই হারালেন কোনো প্রকার শাস্তি ছাড়াই। এসব বলৎকারী ইমামদের কেন কোনো প্রকার শাস্তি দেওয়া হয়নি এবিষয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছে জানতে চাইলে, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি আব্দুল ওয়াদুদ জানান, আলেম মানুষ, হয়তোবা শয়তানের ধোকায় পড়ে ভুল করে ফেলেছেন। তাই বলে সাধারণ মানুষের সামনে তাকে শাস্তি দিয়ে ছোট করা উচিত নয়। মসজিদের সেক্রেটারি সাহেব আরও যোগ করেন, আল্লাহ পাক নাকি আলেমদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলেছেন।

এরকম হাজার হাজার ঘটনা প্রতিদিনেই বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোতে হচ্ছে। কিন্তু বাউতাবাজি ফতোয়ার কারণে বলৎকারীরা শাস্তি পাচ্ছে না। পত্রপত্রিকাগুলোতে এদের সম্পর্কে নিউজ আসছে না। বলৎকারের কারণে ইমাম সাহেবের চাকরি গেলে, সে অন্য মসজিদে ঠিকই ইমামতি করছে এবং ছাত্র বলৎকার চালিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ কি সত্যিই আলেমদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলেছেন?
‘আল্লাহ আলেমদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলেছেন’ এই কথাটি সম্পুর্ণ মিথ্যা। আলেমরা তাদের দোষক্রটি আড়াল করার জন্য আল্লাহর নামে দায়মুক্তি নিতে চাইছে। একজন বলৎকারী আলেম হয় কিভাবে? কোনো বলাৎকারী আর যাই হোক না কেন, অন্তত আলেম হতে পারে না। আর বলৎকারীদের নির্দেশনা অনুসরণ করা কোনো জ্ঞানী মানুষের কাজ নয়।

ধর্ষণ করা অপরাধ। ধর্ষণ হল কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম। আর বলৎকার করা আরও মারাত্মক অপরাধ। বলৎকার হল সমকামিতা। রাষ্ট্রীয় আইন ও ধর্মীয় আইন দুইটিতে অপরাধী। আর একজন অপরাধীকে যে সমর্থন করবে, অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাইবে, সে-ও অপরাধীর সমান। মানে অপরাধী।

কওমি মাদ্রাসা ও মসজিদের মক্তবে ছোট ছোট কোমলমতি বাচ্চাদের বলৎকারের এসব ঘটনা যেহেতু প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে, সেহেতু ওয়াজ মাহফিল ও বিভিন্ন সেমিনারে আলেমদের এসব বিষয়ে কথা বলা উচিত। যেসব আলেম বলৎকারের ব্যাপারে চুপ থাকে, প্রকৃতপক্ষে তারা নিরবে বলৎকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আরও বলৎকার করার জন্য।

Leave a Comment