আসন্ন দুর্ভিক্ষ রোধে রাষ্ট্রের করণীয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলছেন, “আগামী বছর নাকি দেশ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। দেশ যাতে দুর্ভিক্ষের ঝুকিতে না পড়ে, সে জন্য তিনি দেশের আবাদি প্রতি ইঞ্চি জমি খাদ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে বলেছেন। তিনি বারবার বলছেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যাতে দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ অনাহারে মারা না যায়। সরকার আশা করছে, সবাই সেভাবে চলবে। যেভাবে চললে দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা করা যায়।

খাদ্য উৎপাদন করে কারা? উত্তর হবে কৃষকেরা। কৃষক জমি চাষ করে সত্য। কিন্তু ৯০% কৃষক অন্যের জমি চাষ করে। কারণ তাদের নিজের জমি নাই। বাংলাদেশের ৯০% জমির মালিকানা চলে গেছে ধনীদের হাতে। ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে আমাদের দেশে জমির মূল্য অনেক বেশি। দরিদ্র কৃষকরা চাইলেই জমি কিনতে পারে না। জমি কিনার সামর্থ্য দারিদ্র কৃষকদের নেই। জমি কিনছে ধনী ব্যক্তিরা ও কালো টাকার মালিকেরা।

ধনী লোকদের জমিতে অধিকাংশ সময় চাষাবাদ হয় না। ধনী লোকেরা জমির মালিকানা নিয়েই ব্যস্ত, চাষাবাদ নিয়ে তারা তেমন মাথা ঘামায় না। পূর্বে যে পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ হতো, বর্তমানে সেই পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ হয় না। অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ থাকবে পূজিবাদী আমলাদের দখলে। পুঁজিবাদীরা দেশের সবকিছু দখল করে নিবে।

জ্বালানি তেলের মূল্য এক লাফে ৫৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে দুর্ভিক্ষের কথা শুনে দেশের সাধারণ মানুষেরা যখন আতঙ্কিত, যখন দেশের ক্যাপিটালে ৭/৮ ঘন্টা লোডশেডিং, ঠিক সেই মুহূর্তে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের জন্য ৪৩ কোটি টাকা খরচ করে বাসভবন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। অবশ্যই এটিকে বাসভবন না বলে রাজপ্রাসাদ বলাই শ্রেয়।

দেশের ৮০% দারিদ্র্য মানুষ যেখানে আসন্ন দুর্ভিক্ষের যাতাকলে রয়েছে ঠিক সেই সময় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি রাজপ্রাসাদের সামান্য কিছু বর্ণনা দেওয়া যাক। ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় পাশাপাশি নির্মিত হবে দুটি ভবন এবং প্রতিটি ভবন হবে তিন তলা বিশিষ্ট। ১৮৫০০ হাজার বর্গফুটের প্রতিটি ভবনে ৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকা খরচ করে দুইটি সুইমিং পুল নির্মিত হবে।

উপরোক্ত বর্ণনা শুনে অনেকের মনে একটি সম্পুরক প্রশ্ন জাগতে পারে যে, একটি পরিবারে কতজন জল খেলোয়ার থাকলে, একটি পরিবারের জন্য দুইটি সুইমিং পুল করতে হচ্ছে? আবার এই একেকটি ভবনের ভিতরের সাজসজ্জা’য় খরচ করা হবে ২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। দুটি ভবনের ফার্নিচারের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। ২টি ভবনের জন্য ৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১৪টি এলইডি টেলিভিশন। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, এত টেলিভিশন দেখবে-টা কে?

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ইভিএম নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ৮০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ইভিএম কেনার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করেছে। যে টাকা দিয়ে ইভিএম কেনা হচ্ছে, সেই টাকা দিয়ে ১৬ লাখ টন খাদ্য শষ্য কিনা সম্ভব। যেই খাদ্য শস্য কিনলে দুর্ভিক্ষের সময় ১০০% কাজে আসবে।

আক্তারুজ্জামান নামে এক ভাগিনা আমার কাছে জানতে চেয়েছে যে, দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকার অযথা কেন এতো এতো টাকা খরচ করবে? আমি তাকে বললাম, চিন্তা করে কোনো লাভ নাই মামা। দেশের সাধারণ জনগণ যতই কষ্টে থাকুক, তাতে তাদের কিচ্ছু যায় আসেনা।

কি এক পাগলের পাল্লায় পড়েছে দেশবাসী। একদিকে আসন্ন দুর্ভিক্ষের কথা বলে সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে, অন্যদিকে আসন্ন দুর্ভিক্ষ রোধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে দেশের জমানো টাকা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করছে।

আসন্ন দূর্ভিক্ষ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে,- দুর্ভিক্ষ রোধে সরকার ও দেশের সামর্থ্যবান মানুষেরা একসাথে কাজ করতে হবে।

মূলত দেশের নিম্ন আয়ের মানুষেরাই দূর্ভিক্ষের শিকার হয়। আমাদের দেশে ২ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। এই ২ কোটি দারিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে দৈনিক ২,১২২ ক্যালোরি পরিমাণ খাদ্য নিজেদের জন্যে জোটাতে পারেনা। সরকার যদি এই ২ কোটি মানুষের দৈনিক খাদ্য যোগাতে পারে, তাহলেই দূর্ভিক্ষের সময় না খেয়ে মরা ১০০% রোধ করা যাবে।

আসন্ন দুর্ভিক্ষ রোধে সরকারকে প্রথমেই ২ বছরের জন্য খাদ্য শস্য রপ্তানি সম্পুর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে। সেই সাথে খাদ্য শস্য ছাড়া অন্যান্য জিনিসপত্র রপ্তানিতে সরকারকে খুব বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

যেসব জমিতে খাদ্য ছাড়া অন্যান্য শস্য উৎপাদন করা হয়, যেমন, তামাক। সেগুলোর উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। দেশের প্রায় ১ লক্ষ একর জমিতে তামাক চাষ করা হয়। এই ১ লক্ষ একর জমিতে তামাকের চাষ না করে যদি খাদ্য উৎপাদন করা হয়, তাহলে আসন্ন দুর্ভিক্ষ রোধে অনেক কাজে আসবে।

দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করা মানুষদের ২১২২ ক্যালোরি সমপরিমাণ খাদ্যের রেশন দিতে হবে। যাতে দুর্ভিক্ষ চলাকালে মানুষ অনাহারে মারা না যায়।

প্রতিটি ধনী ব্যক্তিকে একটি করে দারিদ্র পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ধনী লোকে সংখ্যা ১৯৩৫১। যদি প্রত্যকটি ধনী ব্যক্তি ১টি দারিদ্র পরিবারের খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব নেয়। তাহলে ৮০ হাজার দারিদ্র পরিবার দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বেঁচে যাবে।

শুধুমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। ফলে দুর্ভিক্ষ চলাকালে রিজার্ভের ওপর একেবারেই চাপ পড়বে না।

Leave a Comment