আসলেই কি নারীর মন বুঝা কঠিন কাজ?

গত ১৮-ই সেপ্টেম্বর রোজ রবিবার দিনটি ছিল স্ত্রীর প্রশংসা দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় রবিবার দিবসটি সারাবিশ্বে পালন করা হয়। কিন্তু আফসোস, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে রবিবারে আমি ডলুরা গিয়েছিলাম, স্ত্রীর প্রশংসা করতে দেরি হয়ে গেল আমার। আসলে আমি কোনো লেখাই সময়মত শেষ করতে পারিনা। কারণ, ওই-যে পেটের তাগিদে জীবিকার সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দৌড়াতে হয়।

পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে, প্রায় সব ধর্মেই বিয়েকে একটি পবিত্র সম্পর্ক মনে করে। বিয়ে হল সেই সামাজিক বন্ধন যা বৈধ চুক্তি যার মাধ্যমে দু’জন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত করে। বিয়ের মাধ্যমে নারী-পুরুষ একে অপরের পাশে আসে। তখন স্ত্রীকে খুশি রাখার বা সুখে রাখার দায়িত্ব পড়ে স্বামীর উপরেই।

স্ত্রীকে খুশি রাখতে বা সুখে রাখতে প্রয়োজন তার মন বোঝার। নারীর মন জগতের কোনো পুরুষ বুঝতে পারছে কিনা সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই আমার।

কিছুদিন আগে আমি স্বপ্নে দেখলাম, কিছু একটা খোঁজতে আমি রান্নাঘরে গিয়ে আলাদীনের চেরাগ পেয়ে গেছি। চেরাগটা হাতে নিয়ে ঘষা দিতেই বিরাট এক দৈত্য চেরাগ থেকে বের হয়ে আসলো। আলাদীনের চেরাগ থেকে দৈত্যটা বের হয়ে এসে বলতে লাগলো, হুকুম করুন মালিক। এই গোলাম আপনার খেদমতে হাজির। দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে, শুধুমাত্র আপনার একটা চাওয়াই পূর্ণ করতে পারব। তাই যা চাইবেন, বুঝেশুনে চাইবেন, বলে দিলাম কিন্তু।

আমি সেই বিশাল আকৃতির দৈত্যকে বললাম, আমি গাড়ি চালিয়ে সৌদি আরবে হজ্জে যেতে চাই। বাংলাদেশ টু সৌদি আরব ফ্লাইওভার তৈরি করে দেও। দৈত্য কিছুক্ষণ নাকে আঙুল ঘষে জবাব দিল, এটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, হে মালিক? পূর্বেই বলেছি, দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে, তাই ছোটখাটো কিছু চান!

আমি দৈত্যকে বললাম, তাহলে বৌয়ের মন বুঝার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেও। আমার আর কিছু লাগবেনা। দৈত্য কিছুক্ষণ মাথা চুলকাইয়া বলল, ফ্লাইওভারটি কয় লেনের হবে, সেটাই বলেন!!

নেট থেকে সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক এস এম জাকির হুসাইন সাহেব “নারীর মন” নিয়ে গবেষণা করে ইতিমধ্যেই প্রথম খণ্ড পাবলিশ করে বাজারে ছেড়েছেন। বইটি বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। বই শেষ পর্যন্ত কয় খণ্ডে গিয়ে দাড়ায় আর লেখক তার জীবদ্দশায় পুরোটা লেখা লিখে যেতে পারবেন কিনা সেই নিয়ে আমি ভীষন চিন্তিত!

বিখ্যাত লেখক আমাদের জাকির সাহেবের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সে এম.বি.এ এবং এমফিল সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও তার ফলিত ভাষা-বিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রী আছে, এম.এস.সি করেছেন কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও।

বাবারে, বাবা! নারীদের মন বুঝতে হলে এত শিক্ষা দীক্ষা থাকতে হয়, সেটা তো আগে জানতাম না। এজন্যই তো মূর্খ লোকেরা বৌয়ের ‘মন’ বুঝতে না পেরে বৌ’রে পিটায়! আর দৈত্য বৌয়ের মন বুঝার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা না দিয়ে বিশাল ফ্লাইওভার তৈরি করে দেয়।

অধিকাংশ নারীই ভেতরে ভেতরে লালন করে দুঃখ আর নিঃসঙ্গতা। তাদের জীবন থাকে অবশাদে ভরা। প্রকৃতপক্ষে নারীদের দুঃখ তাদের মনের, দেহের নয়। তারা তাদের মনকে যেভাবে মেলে ধরতে চায় ঠিক সেইভাবে মেলে ধরতে পারে না। জন্মলগ্ন থেকেই নারীদের বেড়ে ওঠা বড় হওয়ার মধ্যে বেশ কয়েকটি পারিবারিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীরা একেকটি ধাপ অতিক্রম করে আর তাদের মন আরো সঙ্কুচিত হতে থাকে। নারীদের সেই কোমল মনটা সঙ্কুচিত হতে হতে একসময় ভীষণ রহস্যময় হয়ে উঠেছে।

আমাদের বাপ-দাদাসহ ‘রবি ঠাকুর’ এর মত মহাজ্ঞানী কবি সাহিত্যিকেরাও নারীর সহজ-সরল ও কোমল মনটাকে ঘুড়িয়ে প্যাঁচিয়ে জটিল বানিয়ে দিয়েছে!
আরেকটু সহজ করে বলছি, পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞ-বুদ্ধিজীবী পুরুষেরা তাদের সাহিত্যিক, শৈল্পিক, ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে নারীদের সহজসরল ও কোমল মনকে অধরা অস্পৃশ্য আর চরম রহস্যময় হিসেবে উপস্থাপন করেছে জগতের সাধারণ পুরুষদের কাছে।

পুরুষ শাসিত সমাজে কিছু রীতি-নীতি প্রচলিত আছে যে, ঘরের কাজ ও সন্তান লালন পালনের দায়িত্ব শুধুই নারীদের। এমন ধারণা ১০০% ভুল। কারণ সংসারের দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীর উপরেই বর্তায় না। সুখী সংসার ও দাম্পত্য জীবনে সুখের জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অবদানই প্রয়োজন।

পুরুষেরা হয়তো সারাদিন অফিস করে কিংবা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় গিয়ে আরাম করতে চাইছেন। আবার ভাবছেন স্ত্রী তো ঘরেই থাকে, তার আবার আরাম কীসের? আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আপনার স্ত্রী কিন্তু সারাদিন ঘরে বসে বা শুয়ে শুয়ে সময় পার করেনি। সেও সারাদিন ঘরের কাজ করেছেন। সন্তানকে লালনপালন করছে। রান্না করছে, আপনার কাপড়চোপড় ধোয়াসহ সব কাজই সে একা করেছে। কাজেই স্ত্রীর প্রতি সদয় হোন।

তাছাড়া আপনি জানেন কি? শারিরিক শক্তির দিক দিয়ে পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক দূর্বল।

বাসায় ফিরে সবসময় স্ত্রীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুন। সবসময় স্ত্রীর কাজের প্রশংসা করুন। মাঝে মাঝে জোকারের মত হাসিপূর্ণ কথা বলুন। একইসঙ্গে কিছু কাজ ভাগ করে নিতে পারেন, যেমন-বিছানা গোছানো, মশারি টাঙানো, প্রতিবার খাবার পরে থালা-বাসন গুছিয়ে রাখা, বাচ্চাদের পড়ানো। এই কাজগুলো আপনি অল্প সময়েই করতে পারেন। আর তাতে স্ত্রী খুশি হবে।

আর এসব কাজ করতে পারলে, নারীর মন বুঝার জন্য বাজার থেকে জাকির সাহেবদের বই কিনে এনে পড়তে হবে না। আমি ১০০% গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।

পরিশেষে “স্ত্রীর প্রশংসা দিবসে” আমি সেই সকল স্ত্রীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, যারা কথায় কথায় স্বামীদের বলেন, “আমি” দেখে তোমার মত অকর্মার ঘর করছি, অন্য কেউ হলে কখন চলে যেতো।
ওহে স্ত্রীগণ, পৃথিবীর সকল পুরুষদের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, তোমাদের সরলতা ও কোমলতার জন্য।

Leave a Comment