ইউক্রেন যুদ্ধের পোস্টমর্টেম

বাস্তব জীবনে আমি কখনো যুদ্ধ দেখি নাই। কিন্ত টিভির পর্দায় দেখেছি, সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই কিভাবে আকাশ পথে, সমুদ্রপথে এবং স্থলপথে দানবের মত ইউক্রেনে হামলা শুরু করেছে। টিভির পর্দায় এই পৈশাচিক হামলার দৃশ্য দেখে মানুষ হিসেবে নিজেকে লজ্জিত মনে হচ্ছে। অন্যায় ভাবে স্বর্গোদ্যানের মত সুন্দর একটা দেশকে কিভাবে দানবের মত তছনছ করে দিচ্ছে।
শক্তিধর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনেতারা দূর্বল দেশগুলোর মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে। সমস্ত পৃথিবীর শান্তি প্রিয় মানুষ আজ কতিপয় স্বার্থান্বেষী একগুঁয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রনেতাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। শান্তি প্রিয় সাধারণ মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই শক্তিধর রাষ্ট্রনেতাদের কাছে।

পারমাণবিক শক্তিধর একটা রাষ্ট্র যুদ্ধ বাধিয়ে দূর্বল আরেকটা রাষ্ট্রেকে দখল করছে, নিরীহ মানুষ মারছে। বিশ্ব তথা সমগ্র পৃথিবীর সাধারণ মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে উপভোগ করছে সেই দৃশ্য। আজকে ইউক্রেনের এই দৃশ্য দেখে আমার হৃদয়ে এমন ছাপে ফেলেছে যে, পারমাণবিক শক্তিধর যুদ্ধবাজদের তিরস্কারের কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। ধিক্কার জানাই ওই সব রাষ্ট্রনেতাদের, যারা যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদী।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে ন্যাটো। ন্যাটো কি? ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হতে রাশিয়ার ঘোর আপত্তি কেন? ন্যাটো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি আত্মরক্ষামূলক সামরিক জোট। ন্যাটো সদস্য কোনো রাষ্ট্র অন্য কোন রাষ্ট্র দ্বারা আক্রমণের শিকার হলে বাকি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সহায়তা পেয়ে যাবে। এটাই হলো ন্যাটো সামরিক জোটের মুলনীতি। ন্যাটোর আওতায় রয়েছে ৩০টি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানি। এই ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে ইউক্রেন। এ ঘটনা নিয়েই দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

ইউক্রেন চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানির মতো ইউক্রেনও ন্যাটোর সদস্য হতে। আর তাতেই আপত্তি ছিল রাশিয়ার। কারণ বিভিন্ন ইস্যুতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছেনা। আর এই যুক্তরাষ্ট্রই রয়েছে ন্যাটোভুক্ত দেশের তালিকায় ও নেতৃত্বে। আর এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যাটোর আওতায় প্রতিবেশী ইউক্রেনকে দেখতে চায় না রাশিয়া।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি স্বাধীন দেশের প্রতিরক্ষার পথ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। ন্যাটো হলো একটি আত্মরক্ষামূলক সামরিক জোট। আর ইউক্রেন একটি স্বাধীন দেশ। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেন ন্যাটোতে থাকবে কি থাকবে না, সেটা সম্পূর্ণ ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে রাশিয়ার আপত্তি কেন? ইউক্রেন যদি ন্যাটোতে যোগ দেয় তাহলে ন্যাটোর সৈন্য ইউক্রেন-রাশিয়ার সীমান্তে মোতায়েন করা হবে। রাশিয়াকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবে ন্যাটোর সামরিক বাহিনী। আরেকটু সহজ করে বললে বিষয়টা স্পষ্ট হবে যে, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়া মানে যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর সামরিক বাহিনী একেবারে রাশিয়ার পেটের ভিতরে এসে অবস্থান নেয়া। যার ফলে রাশিয়ার চারিদিকের আধিপত্য চলে যাবে ন্যাটো সামরিক জোট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তাই রাশিয়া কখনো চাইবে না যে, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদান করুক। কিংবা রাশিয়া কখনো চাইবে না যে, তার নিজের দোরগোড়ায় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। যার ফলে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়াকে রাশিয়া নিজেদের জন্য এক বিরাট নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

ন্যাটোতে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ক্রুদ্ধ রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের বাকযুদ্ধের (হুমকি-ধমকির) কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে রুপ নিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার যুদ্ধ ঘোষণার পরপরই রাতের আধারে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে তান্ডব চালাচ্ছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। যুদ্ধের শুরুতেই রুশ সেনারা ইউক্রেনের বিমান সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিয়েছে। যাতে ইউক্রেনের সেনারা যুদ্ধ বিমান দিয়ে পাল্টা আঘাত করার সুযোগ না পায়। রুশ সেনাদের ক্রমাগত হামলার মুখে একের পর এক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইউক্রেন। রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অস্ত্র হাতে যুদ্ধের মাঠে নেমেছেন।

প্রেসিডেন্ট থেকে আগ্রাসন বিরোধী যুদ্ধা জেলেনস্কি। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ইতিমধ্যে তিনি অধিকাংশ বাংলাদেশী মানুষের হৃদয়ে জায়গা নিয়েছেন একজন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক হিসেবে। বিবিসি বাংলা খবরে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে মার্কিন সামরিক বিমান দিয়ে নিরাপদে অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেকে বলেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে। আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য আমি আমার সেনাদের যুদ্ধের মাঠে রেখে অন্য কোনো দেশে চলে যেতে পারি না। আমার ফ্লাইট নয়, গোলাবারুদ দরকার। অস্রের দরকার।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি প্রমাণ করে দিয়েছেন, একজন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক কখনো যুদ্ধ বাধিয়ে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে অন্য দেশে চলে যায়না। একজন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক বীরের মতো সামরিক বাহিনীর কাছে থেকে যুদ্ধ করে, প্রতিরোধ গড়ে তুলে। রুশ সেনারা ইউক্রেন আক্রমণের পর তিনি চাইলে মার্কিন সামরিক বিমানে করে পার্শবর্তী কোন দেশে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু না। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সেটা করেননি। তিনি অন্য কোনো দেশে চলে যান নি। বরং তিনি তার সিভিল পোষাক ছুড়ে ফেলে বেছে নিয়েছেন সামরিক পোষাক, হাতে তোলে নিয়েছেন অস্ত্র, ডাক দিয়েছেন প্রতিরোধের।

রাশিয়ার গোলায় ইউক্রেনের ধ্বংসাবশেষ দেখছে বিশ্ববাসী। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউক্রেনের আকাশে শুধুই বারুদের গন্ধ। প্রাণ ভয়ে একের পর এক বাঙ্কার, মেট্রো স্টেশনকে বেছে নিয়েছে সাধারণ মানুষ। একের পর এক রুশ মিসাইলের হানায় ক্ষতবিক্ষত ইউক্রেন। তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ছে একাধিক বহুতল ভবন। ইউক্রেনের আকাশ ছেয়ে গিয়েছে রাশিয়ার যুদ্ধবিমানে। সড়কপথে হানা দিয়েছে গোলাবারুদ, রকেট বোঝাই ট্যাঙ্ক। কিন্তু ভয়াবহ এই হামলা থেকে দেশটির জনগণকে বাঁচাতে তেমন কিছুই করছে না মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো। মিত্রদের এমন আচরণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই টের পেয়েছেন ইউক্রেনের সহজ সরল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিটা একটু বোকা টাইপের। বোকা নাহলে কি শত শত মাইল দুরের লোকের কথায় শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের সাথে যুদ্ধে জড়ায়? যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তাকে বলতে শুনা যাচ্ছে যে, যুদ্ধ শুরুর আগে আশ্বাস দিয়েও বিশ্বনেতাদের কেউ যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করছে না। শুধু তাই নয়, হতাশ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনেছেন। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বহুবার কথা হয়েছে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বারবার বলছেন, তারা আমাকে কথা দিয়েছিলেন সাহায্য করবেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর কেউ সাহায্য করতে আসছেন না।

আমার মতে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা প্রেসিডেন্ট হলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি চাইলেই ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে নিজ দেশের নিরপেক্ষ অবস্থান বা মিনস্ক চুক্তি বাস্তবায়নে সম্মত হয়ে যুদ্ধ এড়াতে পারতেন। তাঁর যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ ছিল। আগ্রাসনের আগে এটাই চেয়েছিল রাশিয়া। কিন্তু তিনি তা না করে মিত্র নামের শত্রুদের পাতানো ফাঁদে পা দিলেন।

মিত্ররা ইচ্ছা করলেই কি ইউক্রেন যুদ্ধ এড়াতে পারতো?

ইউক্রেন যুদ্ধের নেপথ্যে রয়েছে ন্যাটো। ইউক্রেনকে ঘিরে এই সংঘাতের মূলে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের একটাই দাবি, ইউক্রেন যেন ন্যাটো সামরিক জোটে যোগ দিতে না পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়াকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। কিন্তু তারা ( ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো) রাশিয়ার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন। মানে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা আবার রাশিয়াকে সেই নিশ্চয়তা দিতে চায়না। যুদ্ধ শুরুর পরেও বুঝতে পারলাম না, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়ার এই সমঝোতা প্রস্তাব কেন প্রত্যাখান করল? তাদের দ্বারা রাশিয়ার এই সমঝোতা প্রস্তাব প্রত্যাখানের বাস্তবে কোনো মানেই হয় না। কারণ, তারা তো আর সামরিক শক্তি দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করতেও এগিয়েও আসছে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে যদি স্বীকার করতো,
ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি রাশিয়াকে এই নিশ্চয়তা দিতো যে, ইউক্রেনকে তারা কখনোই ন্যাটো জোটে রাখবে না তাহলে কখনোই রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাতো না।
ফলে যুদ্ধটা এড়ানো সম্ভব ছিলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনেই কি ইউক্রেন প্রতিবেশীর সাথে যুদ্ধে জড়িয়েছে?

যুদ্ধে সাহায্য না করায় মিত্রদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগ এনে বারবার বলছেন, আমাদের দেশকে রক্ষার জন্য (সবাই) আমাদেরকে একা ছেড়ে গেছে। তাদের অনেক আশার কথা শুনেছি। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছিলেন, তারা আমাদের সঙ্গে আছেন এবং সমর্থন করছেন। কিন্তু দেশের আত্মরক্ষার বিষয়টি সামনে আসার পর সবাই আমাদের একা করে দিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমি কাউকে দেখছি না। আপনারা প্রমাণ করুন যে, আপনারা আমাদের সাথে আছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কথায় প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে কি তৃতীয় কোনো পক্ষ তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কথা ছিলো? তৃতীয় পক্ষ তাকে কি আশার কথা শুনিয়েছিলেন?

যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের আশ্বাস পেয়েই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মনে করেছিলেন, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করলেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা ইউক্রেন যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে।

পরিস্থিতি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে নানাভাবে ইন্ধন দিয়ে গেছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কথায়। বোকা জেলেনস্কি বুঝতেই পারলোনা যে, তাকে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশ্বাস ছিলো আধিপত্য বিস্তারের নতুন একটি কৌশল।

ইউক্রেনের পরাজয়ে পুতিনের চেয়ে বাইডেনের লাভ বেশি

ইউক্রেন যুদ্ধে লাভের সিংহভাগেই যুক্তরাষ্ট্রের। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা ও এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ন্যাটোকে আবারও আলোচনায় আনা জরুরি ছিল। প্রয়োজন ছিল নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোকে পূর্ন জীবন দান করল ইউক্রেন সংকট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনকে হাতের মুঠোয় এনে ন্যাটোভুক্ত করার টুব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র জানতো, রাশিয়া নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্য হওয়া মেনে নেবে না। রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াবে। আর তাতেও যদি ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদান করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালাবে। আর এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ভয় দেখিয়ে দুরে সরে যাওয়া ইউরোপকে নিজের বলয়ে টেনে আনবে। রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেন তার স্বাধীনতা হারালে কিংবা ন্যাটোভুক্ত না হলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছুই যায় আসে না। রাশিয়ার ভয়টা ইউরোপকে দেখাতে পারলেই হল।

সিরিয়া, ইরাক, ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ব্যয় এবং ওইসব দেশের শরনার্থীদের নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে ইউরোপের অর্থনৈতিক অবস্থা রীতিমতো দূর্বল হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই জার্মানি ও ফ্রান্স ন্যাটো থেকে বের হয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিল। এ নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের কথার কাটাকাটি হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে ইউরোপের দেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ ন্যাটোতে দিতে বলেছিলেন। এর জবাবে ম্যার্কেল বলেছিলেন, দশমিক ৫ শতাংশের বেশি দেওয়া যাবেনা। আর এতে না পোষালে ন্যাটো চলে যেতে পারে। প্রতিত্তোরে ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মানি থেকে ন্যাটোর মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। এছাড়াও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোও মনে করতেন যে, ইউরোপ নিজেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। আর এজন্যেই যুক্তরাষ্ট্র রুপকথার গল্পের মতো জার্মানি ও ফ্রান্সকে রাশিয়ার ভয় দেখাতো।

কথায় বলে, রাখে আল্লাহ মারে কে? ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনতো প্রামাণ্যভাবেই জার্মানি ও ফ্রান্সকে রাশিয়ার হুমকি দেখাচ্ছে। রুপকথার গল্প আর বলতে হচ্ছে না। রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালাতেই ইউরোপীয়রা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজ নিজ দেশের আত্মরক্ষার জন্য নিরাপত্তা চাইছে। ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, পূর্ব ইউরোপসহ ইউরোপে ন্যাটোর ঘাঁটি ও সৈন্যসংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

যুদ্ধে কি ইউক্রেন হারতে বসেছে?

ইউক্রেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ভালো অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধে হেরে যাবে ইউক্রেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভুল পরিকল্পনা করেছিলেন। ফলে ভুলের মাশুল তিনি সার্বভৌমত্ব দিয়ে মেটাবেন। যুদ্ধে জড়ানোর আগে পূর্বানুমান ও পূর্বপরিকল্পনা ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাদের পূর্বানুমান ও পূর্বপরিকল্পনা মিলে যায়, তারাই যুদ্ধে জয়ী হয়। আর যাদের হিসাব-নিকাশ মেলে না, তারাই হয় পরাজিত। ইউক্রেনের পূর্বানুমান পূর্বপরিকল্পনা কোনটাই মেলেনি। নিজের প্রতিবেশী দেশ রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক না রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে গিয়ে রাশিয়ার দিক থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, তা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট অনুমানেই করতে পারেন নি।

রাশিয়ার আক্রমণে ইউক্রেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যদিও কিয়েভবাসী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তারপরও দুই দেশের যে যুদ্ধ চলছে তাতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কি?

যুদ্ধ মানেই পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর এক বিরাট সুযোগ। যুদ্ধ মানেই অস্ত্র বিক্রির নতুন বাজার তৈরি হওয়া। অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধের ফলাফল। আবার এ যুদ্ধের ওপরই নির্ভর করে অস্ত্রের ব্যবসা। যেকারণে যুদ্ধের টানটান উত্তেজনা ছাড়া অস্ত্রের বাজার গরম হয় না। অস্ত্রের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে একটা টেকনিক সবসময় অবলম্বন করতে হয়। পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে অর্থাৎ যেকোনো প্রান্তেই হোক, দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে দ্বন্ধ বা যুদ্ধের সৃষ্টি করে এব্যবসা টিকে আছে। অস্ত্র ব্যবসার এই টেকনিক প্রতিটা অস্ত্র ব্যবসায়ী দেশের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

প্রায় তিন বছর যাবৎ শান্ত মধ্যপ্রাচ্য। ভাইরাসের কারণে যুদ্ধ নেই কোথাও। করোনা ভাইরাসের কারণে যুদ্ধের মাঠ গুলো বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি কমেছে ২১ শতাংশ বা ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসআইপিআরআই এর মতে, বিশ্বের শীর্ষ ২৫টি অস্ত্র উৎপাদক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথম পাচটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ১৬ থেকে ২০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির ৪৭ শতাংশ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। অতএব বলা যায়, করোনা ভাইরাসের কারণে অস্ত্র বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে পড়েছে। তাই অর্থনৈতিক এই মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে চিরাচরিত মার্কিন নীতির পথে হেঁটেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। সীমান্ত ঘেঁষা ইউক্রেনের সাথে প্রায় আট বছর যাবৎ রাশিয়ার যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে পেট্রোল ঢেলে দিয়েছেন বাইডেন। উদ্দেশ্য পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকে টেলে দেওয়া।

যদিও রাশিয়া বারবার বলেছিল যে, তারা যুদ্ধ চায় না কিংবা ইউক্রেন আক্রমণ করার কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। তারপরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানানভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছিল। ইউক্রেন আক্রমণ করবে রাশিয়া এই খবর শুনে, রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ২শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনার চুক্তি করেছে।

রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধে জড়াতে চায় নি। নানানভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার ভয়ে অস্ত্রের মজুত বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়েছে। একদিকে অস্ত্রের জমজমাট ব্যবসা অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোর আত্মরক্ষার নামে ন্যাটোর মাধ্যমে মার্কিন সৈন্যে সরগরম হয়ে উঠেছে ইউরোপীয় দেশগুলোর সীমান্ত। আহ! কি দারুণ ব্যবসা রে বাবা!

এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উন্মাদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন নিউজ চ্যানেল ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকলে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারতাম। এমনকি বাইডেনের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ।

অতএব আমরা নিরদ্বিধায় বলতে পারি, আধিপত্য বিস্তার ও অস্ত্র বিক্রির নতুন রাস্তা খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র সবদিক বিবেচনা করেই ইউক্রেন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আর রাশিয়া বোকার মত নিজের পেশিশক্তি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পালেই হাওয়া দিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে কখনোই রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা হবে না, বরং মার্কিনরা ইউরোপে তাদের আধিপত্য স্থাপন ও অস্ত্র বিক্রির বিরাট সুযোগ পাবে।

রাষ্ট্রনেতারা ভুল করলে সমগ্র জাতিকে তার চরম খেসারত দিতে হয়। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ভুলের জন্য আজকে ইউক্রেনের এমন অবস্থা হয়েছে। তিনি চাইলেই জোটনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে কূটনৈতিকভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি পশ্চিমাদের ইন্ধনে উল্টো প্রতিবেশী রাশিয়াকেই নাস্তানাবুদ করতে চেয়েছিলেন।

একটি যুদ্ধ কখনো কোনো সুফল বয়ে আনে না। যুদ্ধ আনে মৃত্যু, আনে হাহাকার, আনে দারিদ্রতা, আনে কান্না। তাই পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষেরা যুদ্ধ দেখতে চায় না। দেখতে চায় না কোনো অপ্রত্যাশিত অকাল মৃত্যু। দেখতে চায় না কোনো মায়ের সন্তান হারানোর হৃদয় ভাঙ্গা কান্না! শুনতে চায় না কোনো স্ত্রীর স্বামী হারানোর স্বপ্ন ভাঙ্গা হাহাকার।
একটি যুদ্ধে শুধুমাত্র দু’পক্ষেরই ক্ষতি হয়না। ক্ষতি হয় যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দু’পক্ষ ছাড়াও সারাবিশ্বের। যুদ্ধের কারণে প্রায় প্রতিটা দেশেই বেড়েছে তেলের দাম, দ্রব্যমূল্যের দাম।
কূটনৈতিকভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এখনো ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার যেমন ইউক্রেনের রয়েছে, ঠিক তেমনি রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, এমন কিছু করা থেকে ইউক্রেনকে বিরত থাকতে হবে।

10 thoughts on “ইউক্রেন যুদ্ধের পোস্টমর্টেম”

    • নিজ স্বার্থের বিপক্ষে গেলে মোটেও ঠিক নয় বলবেন। আর পক্ষে থাকলে বলবেন ঠিক আছে। এটা মানুষের কেমন নীতি?

      Reply

Leave a Comment