উত্তপ্ত রাজনীতি: গণতন্ত্রই শেষ পথ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক দশকের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, বীর উত্তম শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়া সাহেবের জীবদ্দশায় বিএনপি দল হিসেবে তেমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। যার মূল কারণ হল প্রকৃত নেতা বা শাসক হিসেবে দাঁড়িপাল্লায় ওঠার অনেক আগেই জিয়াউর রহমানের মৃত্যু। কারণ ১৯৮১ সালের ৩০শে মে গভীর রাতে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান শহিদ হন।

মূলত শহিদ জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর তার সহধর্মিণী বেগম খালেদার নেতৃত্বে বিএনপি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী দল হতে শুরু করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মূলত আওয়ামীলীগ বিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম।

এক সময়ের বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও শক্তিশালী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসহায়ত্ব দেখলেই দলটির একসময়ের জাঁদরেল নেতাদের কথা আমার মনে পড়ে। যে নেতারা দলীয় নেত্রীকে শেষ গন্তব্যে অসহায় অবস্থায় একা ফেলে নিজ নিজ বাসায় বসে বসে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন। আপোষহীন নেত্রীর এমন অসহায়ত্ব দেখে অনেকেই বলে বেড়াচ্ছে যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ধ্বংস হয়ে গেছে। আসলে তাদের সেই ধারণা সম্পুর্ণ ভুল।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মরেনি। নির্বাসিত নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভেতরে ভেতরে বিএনপি অতীতের চেয়ে আরোও শক্তিশালী হচ্ছে। বিএনপি যে কতটা শক্তিশালী দল তা দেখার জন্য বা বোঝার জন্য আপনার কোনও গানিতিক জ্ঞান থাকার দরকার নেই।

একটানা তৃতীয় মেয়াদে দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগ নেতাদের কথা শুনলেই আপনারা বুঝতে পারবেন, তাদের মূল নিশানা বা প্রতিপক্ষ আসলে কারা?

আওয়ামীলীগের কাছে বিএনপি কোনো দুর্বল প্রতিপক্ষ নয়। আর সে কারণেই আওয়ামীলীগ নামেমাত্র বিরোধীদল জাতীয় পার্টিকে কোনো পাত্তা দেয় না। আপনারা আওয়ামিলীগ নেতাদের ভাষণগুলো লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন, তাদের সব ভাষণেই ঘুরে ফিরে বিএনপির কথা আসে। আর তাতেই প্রমাণিত হয় যে, কার্যত বিরোধী দল আসলে এখনো বিএনপি।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই আমাদের দেশের রাজনীতিতে মুসলিমলীগ অদৃশ্য। মুসলিমলীগের ভাবধারা, আদর্শ ও সমর্থক সবগুলোই কি মরে গেছে? মুসলিমলীগের সমর্থকরা আছে। মুসলিমলীগের সমর্থনের জায়গাটা বিএনপিই হবে। এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তব। এর সাথে আরও যোগ হয়েছে বামপন্থি দলগুলো থেকে সরে আসা নেতৃত্বের একটি বড় অংশ। এদের সবাইকে দেখলেই আপনারা বুঝবেন, আমার কথাটা কতটুকু সত্যি।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে জিতে একতরফা দেশের শাসন ক্ষমতায় বসে থাকাটা দেশের কোন রাজনৈতিক দলের জন্যই মঙ্গলজনক হবার কথা নয় কিংবা একতরফা দেশের শাসন ক্ষমতায় বসে থাকাটা কোনো রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী করে না। দেশের সচেতন জনগণের কাছে, দলগতভাবে রাজনীতিতে তাদের সাংগঠনিক যোগ্যতা কমে যায়। সেই চির বাস্তব কথাটি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলই বুঝেনা না। তবে ক্ষমতা হারানোর পরে সবাই স্পষ্ট বুঝে। এই বাস্তব কথাটি পৃথিবীর বহু দেশ ও জাতি বিশ্বাস করলেও আমরা বিশ্বাস করতে চাই না।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা আর যাই হোক না কেন, রাজনীতির মাঠ আবারও কিন্তু গরম হতে শুরু করেছে। আর উত্তপ্ত রাজনীতির মূল কারণ হচ্ছে আসন্ন নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে দেশের সাধারণ জনগণের একটাই প্রত্যাশা। আসন্ন নির্বাচনে যেন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এবারের নির্বাচনে সাধারণ মানুষ যেন ঠিক মতো নিজের ভোট নিজেই দিতে পারে। ভোট গণনা যেন সঠিক মতো হয় এবং ভোটের ফলাফল যেন পাল্টে না যায়।

কোনো দেশের সবচেয়ে বেশি অপমানজনক বিষয় হল, নির্বাচন বিষয়ে বিদেশি দূতদের হস্তক্ষেপ করা। নির্বাচন নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ করার কারণগুলো কারো অজানা নয়। আওয়ামিলীগ যদি ভোটের সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে কার সাধ্য ছিল নির্বাচন নিয়ে নাক গলানোর বা মাথা ঘামানোর? দেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের নাক গলানোর পথটা সরকারেই সুগম করে রেখেছে।

নির্বাচন নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের মাথা ঘামানো বন্ধ করতে হলে নির্বাচন সঠিক করার বিকল্প নাই। শুদ্ধ গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প নাই। উত্তপ্ত রাজনীতি: গণতন্ত্রই হবে শেষ পথ।

Leave a Comment