ওসি প্রদীপ: এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম

আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য যখন কোনো অপরাধ করে তখন তার স্বাভাবিক একটি শাস্তি হলো: হয় বদলি করা আর না হয় সাময়িক বরখাস্ত করা। কিন্তু বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করাই কি এ ধরনের অপরাধীর শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট? সমাজের চেতনার ঠিকা নেয়া চেতনাবাজরা বলছেন, “গুটিকয়েক লোকের জন্য পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা যাবে না’। আমি সেই চেতনাবাজদের সাথে একমত নই। অপরাধ দমন করাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। কাজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে একজন অপরাধী যতক্ষন পর্যন্ত থাকবে, ততক্ষন পর্যন্ত এর দায় গোটা বাহিনীরই। কারণ, যখন অপরাধীর অপরাধ স্পষ্ট, তখন সে কোন যুক্তিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে পারে? কোনো পুলিশ সদস্যের অপরাধ স্পষ্ট হবার পরেও ওই পুলিশ সদস্যকে তার পদে বহাল রাখা আর শুটকির আরতে বিড়ালকে পাহারাদার দেওয়া সমান কথা। যতক্ষন পর্যন্ত না অপরাধ করা মাত্রই পুলিশ সদস্যকে শাস্তির আওতায় আনা হবে ততক্ষন পর্যন্ত পুরো পুলিশ বাহিনীই কলঙ্কিত।

ওসি প্রদীপ ১৯৯৬ সালে পুলিশে যোগ দেয়। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের কোতয়ালি থানায় চাকরিকালে এক নারীর জমি দখলের ঘটনায় বরখাস্ত হয় সে। পরে কক্সবাজারের চকরিয়ার এসআই হিসেবে কাজ করে। এরপর জেলার মহেশখালীতে ও সর্বশেষ টেকনাফের ওসি হিসেবে কাজ করে। ২০০৪ সালে যখন তার বিরুদ্ধে এক নারীর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছিল, তখন যদি তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে সে কখনো ওসি হওয়ার যোগ্যতা পেতো না। আর যদি সে ওসি না হতো তাহলে টেকনাফ থানায় ১০৬টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭৪ জন নির্দোষ ব্যক্তি নিহত হতো না।


ওসি প্রদীপের অপরাধ জগত কেমন ছিলো তার সামান্য কিছুর বিবরণ মেলে সিনহা হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ার বাণিজ্যে মেতে উঠে সে। মাদক নির্মূলের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওসি প্রদীপ।
আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নিরীহ কিছু পরিবারকে টার্গেট করতো সে। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নিরীহ মানুষদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আবার অনেককে ক্রসফায়ার দিয়ে টাকা কামানোর এক জঘন্য খেলায় লিপ্ত ছিল সে।

ওসি প্রদীপ


নিজের সাজানো ঘটনায় কোন ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার করে অথবা টার্গেট কোন ব্যক্তিকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে প্রথমত ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হতো। তারপর তার নিজস্ব সোর্স অর্থ আদায়ের জন্য দরকষাকষি করতো । তারপর ভিকটিমকে ক্রসফায়ার না দেয়ার বিনিময়ে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতো । চাহিদা অনুয়ায়ী টাকা না পেলে ভিকটিমকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করতো। তারপর ক্রসফায়ারে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনদের মামলার আসামি করা হতো। অধিকাংশ সময় নিজস্ব সোর্স কতৃক ধার্য করা টাকা পাওয়ার পরেও ভিকটিমকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হতো। অধিকাংশ সময় সাজানো মামলায় আসামিদের বাড়িঘর হতে উচ্ছেদ ও বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ, সম্পদ বেদখল করে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তার মূল পেশা।
পছন্দ হলেই যেকোনো সুন্দরী মেয়েকে মাদক কারবারির তকমা দিয়ে বাড়ি থেকে তুলে থানায় এনে ধর্ষণ করতো বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, এ পর্যন্ত টেকনাফের শতাধিক তরুণীকে ধর্ষণ করেছে সে। উখিয়ার কোর্ট বাজারের নির্যাতিতা এক তরুণীর অভিভাবক জানান, ২০১৯ সালের শেষের দিকে তাদের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে টেকনাফে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গেলে প্রেমিকসহ কয়েকজন মিলে তার মেয়েকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি ওসি প্রদীপ পর্যন্ত গড়ায়। ওই সময় ধর্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রদীপ নিজেও কয়েক দিন আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণের পর ইয়াবা দিয়ে ওই তরুণীকে কোর্টে চালান করে দেয়।
প্রদীপ এই অপরাধ জগতের কাজগুলো গোপন রাখার জন্য তার সমমনা পুলিশ সদস্যদের দ্বারা নিজস্ব একটি পেটোয়া ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে।


ওসি প্রদীপ ছিল তার অপকর্মের বিষয়ে সদা সতর্ক। তার অপকর্মের বিষয়ে যেন কেউ জানতে না পারে, সংবাদ সংগ্রহ করতে এবং প্রচার করতে না পারে সে বিষয়ে প্রদীপ কুমার দাশ ছিল খুবই সতর্ক। কিন্তু প্রদীপের এই দূর্বল জায়গায় হাত দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ।
২০২০ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য কক্সবাজারে যান। সেখানে তিনি ও তার সঙ্গীরা নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মেজর সিনহার ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহাকে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা পীড়িত হন। ওসি প্রদীপের অত্যাচারের শিকার কিছু মানুষের সাক্ষাৎকারও তিনি নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ


এবিষয়ে প্রদীপের সঙ্গে মেজর সিনহা ও তার সঙ্গীদের কথাও হয়েছিল। বিপদ আঁচ করতে পেরে নিজের অপরাধ গোপন রাখার জন্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে ওসি প্রদীপের নির্দেশে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী। কোনকিছু বুঝে উঠার আগেই রক্তখেকো হায়েনার গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন বীর সৈনিক সিনহা। সিনহা ওসি প্রদীপের কাছে পানি চান। ওসি প্রদীপ সিনহাকে পানি না দিয়ে গলায় পাড়া দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।


ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টিকারী
বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি সোমবার কক্সবাজারের একটি আদালত ওসি প্রদীপ এবং ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে ৬ জনের।

একজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন হত্যাকান্ডে দেশের মানুষকে স্তম্ভিত, বেদনার্ত ও ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের আপামর মানুষ সোসাল মিডিয়ায় সিনহা হত্যাকান্ডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই নির্মম অপরাধের সাথে জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানায়। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে হয়তোবা দেশের আপামর জনগণের ইচ্ছার কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু তাতে কি ওসি প্রদীপ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীদের অবস্থার পরিবর্তন হবে?

এসআই লিয়াকত আলী


ওসি প্রদীপ একা নয়। বাংলাদেশের থানায় থানায় শত শত প্রদীপ রয়েছে। এদের সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হওয়াই সমাজে অনেক অপরাধের পুনরাবৃত্তির প্রধান কারণ। কোনো অপরাধী যখন বিচারের মুখোমুখি হয়ে আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়, তখন তার মনে এই ধারণাই জন্মে যে, অপরাধ যত বড়ই হোক সে বার বার পার পেয়ে যাবে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল ওসি প্রদীপের ক্ষেত্রে। ২০০৪ সালে যখন তার বিরুদ্ধে এক নারী জমি দখলের অভিযোগ এনেছিলেন, তখন যদি তাকে সাময়িক বরখাস্ত না করে, সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হতো তাহলে পরবর্তীতে তার হাতে ১৭৪ জন নির্দোষ ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধের নামে প্রাণ হারাতো না। ২০০৪ সালে ওই নারীর জমি দখলের অভিযোগে ওসি প্রদীপকে কঠোর শাস্তি না দেওয়ায় সে নতুন করে বড় বড় অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত হয়েছে।

আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা আজো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর টর্চার সেলের লোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে সিনেমা তৈরি করছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরেও এই দেশের বুকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চাইতেও ভয়ংকর একটি বাহিনী ধীরে ধীরে কিভাবে গ্রাস করে চলেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভুমিকে সেবিষয়ে তো তারা কোনো ধরণের চলচিত্র নির্মাণ করেনা। পরিশেষে বলবো, দুষ্টের দমন ও শিষ্ট্রের লালনে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

15 thoughts on “ওসি প্রদীপ: এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম”

  1. দেশটা হলো পুলিশি রাষ্ট। কাজেই এই দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে কিছু বলা ঠিক না।

    Reply
  2. এই রকম লেখালেখি করুন। আলেমদের পিছনে লাগবেন না।

    Reply
    • আলেমদের পিছনে লাগার ইচ্ছা আমার নেই। যা সত্য তা লেখা আমার প্রিয় একটি শখ

      Reply
      • হতে পারে কোনো একজন আলেম এরকমটা করেছেন। তাই বলে কি আপনি সব আলেমকে এক পাল্লায় মাপবেন??

        Reply
  3. পুলিশের কারণেই শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ঠিকে আছে

    Reply

Leave a Comment