কামড়ানো এখন মানুষের স্বভাব

আমাদের দেশে কামড়ের ঘটনা একটু কম ঘটলেও, কামড়াকামড়ি কিন্তু কম ঘটেনা। কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে, জমিজমা নিয়ে, ধর্ম নিয়ে অথবা অন্য যেকোনো কারণে আত্মীয়স্বজন এমনকি পাড়া প্রতিবেশীদের মাঝে বিরোধ আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। এসব বিরোধের কারণেই খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে, মামলা মোকদ্দমা হচ্ছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষেই আছেন, যারা সামান্য কিছু নিয়ে কারো সাথে ঝগড়াঝাটি বা কথার কাটাকাটি করলে, খুনাখুনি না হওয়া পর্যন্ত সেই বিরোধ জিইয়ে রাখেন।এসব বিরোধের কারণে আত্মীয়স্বজনের মাঝে যুগ যুগ ধরে দেখাদেখি না হওয়ার নজিরও কম নয়।

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তাই বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে
মানুষের শোভা পায়।
ঘটনা কিছু আলাদা হলেও, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কথার একেবারেই বিপরীত কাজ করেছেন এক যুবক। কুকুরকে নয়, কুত্তা বলে কটাক্ষ করার প্রতিবাদে একই পরিবারের ৬ জনকে কামড়ে দিয়ে আলোচিত হয়েছেন পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার এক যুবক।

সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঝাঁটরা গ্রামে কালাম সর্দার ও আনোয়ার শিকদারের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলে আসছেল। সম্প্রতি এক বিকেলে কালাম সর্দার বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রতিপক্ষের ১০ বছরের একটি ছেলে তাকে ‘কুত্তা কালাম’ বলে ডাক দেয়। কালাম সর্দারের ধারণা, আনোয়ার শিকদারের পরিবার ওই ছেলেকে শিখিয়ে দিয়েছে তাকে কুত্তা বলে ডাকার জন্য। তাই ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ লোকজন নিয়ে আনোয়ার শিকদারের বসতঘরে ভাঙচুর চালান আনোয়ার। একপর্যায়ে পরিবারের ছয়জনকে কামড়ে আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আটজনের নামে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে কি-জানি অদ্ভূত একটা ব্যাপার রয়েছে। আপনি কাউকে বাঘ বা বাঘের বাচ্চা বলুন, সে খুব খুশি হবে। কিন্তু আপনি কাউকে কুত্তা বা কুত্তার বাচ্চা বললে, সে ভীষণ রেগে গিয়ে আপনার দিকে ত্যারে আসবে। অথচ বাঘের চেয়ে কুকুরের স্বভাব অনেক ভালো। কুকুর যদি অনাহারে থাকে, আর আপনি সেই কুকুরকে খাবার খেতে দেন, তাহলে সেই কুকুর আপনাকে কখনো কামড়াবে না। কিন্তু আপনি বাঘকে প্রতিদিনই খাবার খেতে দেন, কোনো কারণ বসত যদি একদিন কোনো খাবার খেতে না দেন, তাহলে সেই বাঘ আপনাকেই খেয়ে ফেলবে।

ছবিঃ সংগৃহীত

কুকুর যতই খ্যাতিমান, মহানুভব, পরোপকারী কিংবা প্রভূভক্ত প্রাণী হোক না কেন, আমরা কেউ-ই কুকুর হতে চাই না। আমরা চাই মানুষের মতো মানুষ হতে। মানুষের মতো বাঁচতে! কামড় খাওয়া কিংবা কামড় দেয়া মানুষের স্বভাবের মধ্যে পরেনা।

আমাদের সমাজে মানুষের নামের সঙ্গে বিশেষণ যোগ করা বা নাম বিগরানি একটা খুব সাধারণ ব্যাপার। যেমন, একটু খাটো হওয়ায় বাইট্টা সোহাগ, একটু লম্বা হওয়ায় ফেরাউন মোফাজ্জল, একটু হালকা হওয়ায় পাটকাটি রাজু, একটু মোটা হওয়ায় শের আশিক, ত্যারা বশীর, কানকাটা রমজান ইত্যাদি।

মানুষ তার নামে পরিচিত হবে। নাম দিয়েই সবাই তাকে চিনবে। এমটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে কাউকে কাউকে চেনার জন্য নামের আগে একটি অন্য শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়। যেমন, গোজা আলম, ডগ সেলিম, লাটি খোকন, টাকলা মুরাদ, পিচ্চি স্যার, ল্যাংটা সোলেমান, কালা জাহাঙ্গীর, বাটপার হুমায়ুন, টোকাই সোহাগ ইত্যাদি।

ছবিঃ সংগৃহীত

এগুলো সমাজের সুস্থ ও স্বাভাবিকতার চিত্র নয়। সমাজ যে ক্রমেই রুগ্ন হয়ে পরেছে, তা-ই সম্ভবত এসব নামের মাধ্যমে ফুটে উঠছে। তবে সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো, ইদানীং কি এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের মধ্যে জন্তু জানোয়ারের স্বভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। কামড়ে দেওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। আক্ষরিক অর্থে হয়তো ‘কুত্তা কালামের মতো মানুষ মানুষকে কামড়াচ্ছে না। কিন্তু নানাভাবেই একে অপরকে কামড়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। পরিবারে, অফিসে, ফেইসবুকে, গণমাধ্যমে, সমাজে, রাষ্ট্রে সবখানে কামড়ানোর প্রবণতা। কামড়াকামড়ি এখন রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে পুরো সমাজকে গ্রাস করছে। অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে করে আগামী দিনে মানুষের আকার আকৃতি বদলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

Leave a Comment