ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়

পত্রিকায় ধর্ষণের খবর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে ধর্ষণ যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। কিন্তু কেন ধর্ষণের সংখ্যা এতো বৃদ্ধি পাচ্ছে? কী করলে কমবে এ জঘন্য অপরাধ? একদিকে নারী স্বাধীনতা, নারী আন্দোলন, নারী অধিকার নিয়ে সর্বত্র আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। অন্যদিকে বেড়ে চলেছে ধর্ষণের সংখ্যা৷ সম্প্রতি আমাদের সুনামগঞ্জে ৭ দিনে ৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যার বেশিরভাগই শিশু। এসব ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে, মানবন্ধন হচ্ছে, জনরোষে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের ধরতে হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তিও হচ্ছে। কিন্তু তারপরও ধর্ষণের মত মহামারি বন্ধ না হয়ে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু কেন? ধর্ষণের জন্য কারা দায়ী? কী করে ধর্ষণ কমিয়ে আনা সম্ভব? সমাজে ধর্ষিতা নারীদের কী-ই বা করা উচিত? প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, শাস্তি কোনকিছু দিয়েই ধর্ষণ ঠেকানো যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ধর্ষণের পক্ষে বিপক্ষে লেখা হচ্ছে। নারীবাদীরা ধর্ষণের জন্য ধর্ষকের মানসিকতাকে দায়ী করে ধর্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের দাবি করছেন। আবার কট্টরপন্থি ধর্মান্ধ ও নারীবাদ বিরোধীরা ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতার পোশাক ও বেহায়াপনাকে দায়ী করছেন। নারীবাদী, নারীবাদ বিরোধী ও কট্টরপন্থি ধর্মান্ধদের এসব যুক্তি-তর্ক যারা অলরেডি ধর্ষিত হয়েছেন, হচ্ছেন অথবা হবেন তাদের কোনো উপকারে আসছে বলে আমি মনে করিনা।

আমাদের দেশে ধর্ষণের পরিসংখ্যানটা তৈরী করা হয় মুলত সংবাদপত্রের প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। অর্থাৎ বাস্তবে ধর্ষনের ঘটনা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। ধর্ষিত হওয়ার পরও লোক-লজ্জার ভয়ে আইনের আশ্রয় নিচ্ছে না অনেকেই। এজন্য বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসুত্রতাকে দায়ী করা যেতে পারে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে উল্লেখ রয়েছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু এমন অনেক মামলা আছে যে, বছরের পর বছর ধরে মামলা চলছে। ধর্ষণের মামলা চলাকালীন বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আইনের আশ্রয় নিতে ধর্ষিতা নারীদের মনে অনীহা তৈরি করেছে।

প্রতিকী ধর্ষণ চিত্র

ধর্ষণের সংজ্ঞঃ
আমাদের দেশের দন্ডবিধি ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোন পুরুষ নিম্নবর্ণিত পাঁচ প্রকারের যে কোন অবস্থায় কোন নারীর সাথে যৌন মিলন করে তবে সে ব্যক্তি নারী ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে।
১। কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
২। কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া।
৩। কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে।
৪। নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়)।
৫। কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই আশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।
উপরোল্লেখিত বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩৭৫ ধারার ৪ ও ৫ নাম্বার পয়েন্ট বাদ দিলে ধর্ষণের সংজ্ঞা হবে নিম্নরুপ: পুরুষের ইচ্ছায় এবং নারীর অনিচ্ছায় বিপরীত দুটি লিঙ্গের মাঝে যে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয় তাকে পাশবিক অত্যাচার, বলাৎকার, পীড়ন বা ধর্ষণ বলা যায়।

ধর্ষণ কেন করেঃ
প্রতিটি মানুষের মাঝেই শারীরিক চাহিদার বা যৌন চাহিদা রয়েছে। মানুষের বিভিন্ন আবেগ, অনুভূতি বা মূল্যবোধ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে অতিমাত্রায় চটির গল্প পড়ার ফলে বা পর্ন ভিডিও দেখার ফলে যৌন সুড়সুড়ি বেড়ে যায়। তাই ধর্ষক তার এই শারীরিক চাহিদা বা যৌন চাহিদার তড়িৎ বাস্তবায়ন করতে অন্যের ইচ্ছার বাহিরে জোরপুর্বক যৌনসঙ্গমের আশ্রয় নিয়ে থাকে।

সুনামগঞ্জে ৭দিনে ৬টি ধর্ষণের ঘটনাঃ
গত ১লা এপ্রিল তাহিরপুরে এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করে কামরাবন্দ গ্রামের বখাটে রইস আলী। গত ৪ষ্টা এপ্রিল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের পাশে রাতে ওরসে আসার পথে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে হাসান আলী নামে এক যুবক। গত ৭ এপ্রিল তাহিরপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কিশোরি কন্যাকে ধর্ষণ করে লাকমা গ্রামের হযরত আলী। একই দিন ছাতকে ১ম শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রীকে খেলা থেকে বসতঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে ভৈষারকান্দি গ্রামের ফয়জুল ইসলাম। গত ৮ এপ্রিল জামালগঞ্জের পাকনার হাওর থেকে ছাগল আনতে গিয়ে এক বখাটে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে।

চটির বইয়ের গল্পের মত বা পর্ণ ভিডিও স্টাইলে ধর্ষণঃ
ছোট শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ, প্রেমের ফাঁদ পেলে ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ, পীর সেজে শিষ্যকে ধর্ষণ, ঠাকুর সেজে ভক্তকে ধর্ষণ, দাতা সেজে ধর্ষণ, সাহায্যের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ, ডেকে নিয়ে ধর্ষণ, জোর করে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, চাকুরীর লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ, নায়িকা বানানোর আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ, ডাকাতি করতে গিয়ে ধর্ষণ, পুরুষ হয়েও ছেলে শিশুকে ধর্ষণ, দলবেধে ধর্ষণ, ক্ষমতাসীন হয়ে ধর্ষণ, জন্মদিনের পার্টিতে নিমন্ত্রণ করে ধর্ষণ, বাবা হয়ে মেয়েকে ধর্ষণ, মামা হয়ে ভাগ্নিকে ধর্ষণ। ধর্ষণের খবর পড়লে মনে হয়, এ যেন চটির গল্প বা পর্ণ ভিডিওরেই বাস্তব প্রতিছব্বি।

পর্নগ্রাফি স্টাইলে ধর্ষণ। প্রতিকী চিত্র

কোথায় কোথায় হচ্ছে ধর্ষণঃ
মসজিদে ধর্ষণ হচ্ছে, মন্দিরে ধর্ষণ হচ্ছে, গীর্জায় ধর্ষণ হচ্ছে, ধর্মগুরু রামরহিম ও আসারামদের আশ্রমে ধর্ষণ হচ্ছে, মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে কোমলমতি বাচ্চারা ধর্ষণ হচ্ছে, মাদ্রাসায় ধর্ষণ হচ্ছে, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ হচ্ছে, চলন্ত বাসে ধর্ষণ হচ্ছে, চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণ হচ্ছে, পরিত্যক্ত বাড়িতে ধর্ষণ হচ্ছে, জঙ্গলে ধর্ষণ হচ্ছে, রাস্তায় ধর্ষণ হচ্ছে, বাড়িতে ধর্ষণ হচ্ছে, হোটেলে ধর্ষণ হচ্ছে, অফিসে ধর্ষণ হচ্ছে, বাংলোতে ধর্ষণ হচ্ছে, বারে ধর্ষণ হচ্ছে, বর্ষবরণ অনুষ্টানে ধর্ষণ হচ্ছে, চিপায়-চাপায় ধর্ষণ হচ্ছে, নায়িকা ধর্ষণ হচ্ছে, ধান ক্ষেতে ধর্ষন হচ্ছে, এমনকি শরনার্থী শিবিরেও ধর্ষণ হচ্ছে। বলতে পারেন, কোথায় ঘটে নাই ধর্ষণের ঘটনা?

কে করে নাই ধর্ষণঃ
মসজিদের হুজুরে ধর্ষণ করছে, মন্দিরের ঠাকুরে ধর্ষণ করছে, ধর্মগুরু রামরহিম ও আসারাম তাদের আশ্রমে ভক্তকে ধর্ষণ করেছে, গীর্জার ফাদারে ধর্ষণ করছে, মাদ্রাসার শিক্ষকে ধর্ষণ করছে, স্কুলের শিক্ষকে ধর্ষণ করছে, খ্রিষ্টান মিশনারী স্কুলের শিক্ষকে ধর্ষণ করছে, পীরে কামেলে শিষ্যকে ধর্ষণ করছে, মাজারে খাদেম ধর্ষণ করছে, ঠাকুর মন্দিরে পুজা দিতে আসা ভক্তকে ধর্ষণ করছে, অফিসে বস ধর্ষন করছে, চলচিত্র পরিচালক ধর্ষণ করছে, ক্ষমতাসীনরা চাকরীর আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ করছে, বাস হেল্পার ধর্ষণ করছে, কৃষক ধর্ষণ করছে, শ্রমিক ধর্ষণ করছে, বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করছে, চাচা ভাতিজিকে ধর্ষণ করছে, মামা ভাগিনিকে ধর্ষণ করছে, দেবর বউদিকে ধর্ষণ করছে, প্রেমিক প্রেমিকাকে ধর্ষণ করছে। বলেতে পারেন, কে করে নাই ধর্ষণ?

কে ধর্ষিত হয় নাইঃ
মন্দিরে পুজা দিতে এসে ভক্ত ধর্ষিত হয়েছে, আশ্রমে ধর্মগুরুর কাছে বক্ত ধর্ষিত হয়েছে, মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে এসে কোমলমতি ছোট ছোট মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছে, পীরের বাড়িততে এসে শিষ্য ধর্ষিত হয়েছে, স্কুলে-কলেজ ও মাদ্রাসায় ছাত্রী ধর্ষিত হয়েছে, চলন্ত বাস ও ট্রেনে যাত্রী ধর্ষিত হয়েছে, নায়িকা ধর্ষিত হয়েছে, শিক্ষিকা ধর্ষিত হয়েছে, মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে বারে ধর্ষিত হয়েছে, চাকরি খুজতে গিয়ে ধর্ষিত হয়েছে, চাকরি করতে গিয়ে অফিসে ধর্ষিত হয়েছে, বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে ধর্ষিত হয়েছে, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্টানে গিয়ে ধর্ষিত হয়েছে, মেলা দেখতে গিয়ে ধর্ষিত হয়েছে, দেবরের কাছে বৌদি ধর্ষিত হয়েছে, বাবার কাছে মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, ভাইয়ের কাছে বোন ধর্ষিত হয়েছে, মামার কাছে ভাগ্নি ধর্ষিত হয়েছে। বলতে পারেন কে ধর্ষিত হয় নাই?

ধর্ষণের জন্য পুরুষের বিকৃত মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দায়ীঃ
কোথাও ধর্ষণ হলেই নারীবাদীরা ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ করেন, মানবন্ধন করেন। তারা ধর্ষণের জন্য ধর্ষকের বিকৃত মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করেন। আমি নারীবাদীদেরকে বলবো, খামারের দোকানে কোরআন তেলাওয়াতের কোনো মূল্য নেই। আর চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। তাই আপনারা কার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করবেন? আপনারা কিভাবে বিকৃত মানসিকতার ওইসব পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করবেন? আপনারা কি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য ওইসব বিকৃতমনা পুরুষদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করবেন? নাকি ওইসব বিকৃত মানসিকতার পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য কোন ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন? বলেন কিভাবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করবেন? কোরআন, হাদিস, বাইবেল, রামায়ন, গিতা, ক্রিপিটক এইসব বই পড়িয়ে ধর্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করবেন? আমি আগেই বলেছি, চোর কখনো ধর্মের ধারে কাছেও যায়না। তাহলে কি আপনারা উপদেশ শুনিয়ে ধর্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করবেন? না, তাতেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে পারবেন না। কেন পরিবর্তন করতে পারবেন না, তা বোঝানোর জন্য নারীবাদীদের কয়েকটি উদাহরন দিচ্ছি, হিন্দু ধর্মের গুরু যে রামরহিম মানুষকে ধর্মীয় উপদেশ দিয়েছে। আবার সেই রামরহিমেই নারীদের আশ্রমে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। যে হুজুর বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বসে মানুষদের উপদেশ দিয়েছে, আবার সেই হুজুরেই মক্তবে কোমলমতি ছোট মেয়েদের ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ হবার পর ধষিতা যখন অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছে, সেই পুলিশেই ধর্ষিতাকে আবার ধর্ষণ করেছে। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সেই মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকেই তার ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। মেয়েদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হল তাদের পরিবার। মেয়েরা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার বাবাকে। আর সেই বাবাই তার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষক কখনো সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ হতে পারেনা। ওরা পশু। তাই পশুর কাছে মানবিক কিছু আশা করা যায় না। আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে, ভালো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সর্বদাই ইতিবাচক। আর খারাপ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো ইতিবাচক হবেনা। কথায় আছে না, চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। আর গুটিকয়েক ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেই কি সমাজ থেকে ধর্ষণের মত মহামারি বন্ধ হয়ে যাবে? না, কখনো দুর হবেনা।

গণধর্ষের প্রতীকী চিত্র

আইন করে কখনো ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না। তাতে যত কঠোর শাস্তির বিধানেই করা হোক না কেন।

ধর্ষণ জন্য দায়ী নারীর পোশাকঃ
আদিম যুগের মানুষ গাছের ছাল বা লতা-পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখতো। এখন যুগ পাল্টেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন এসেছে পোশাকেও। কিন্তু আজ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, নারীবাদ বিরোধী আমাদের দেশের কিছু আলেম ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার জন্য নারীর সেই অধুনিক পোশাককেই দায়ী করে আসছেন। ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতার পোশাককে দায়ী করে ধর্ষককে আরও ধর্ষণ করতে উৎসাহিত করছেন তারা। ধর্ষণের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ধর্মান্ধ আলেমরা বলছেন, ধর্ষণের জন্য নারীরাই দায়ী। নারীর পোশাকেই দায়ী। ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করে ধর্মান্ধ আলেমরা ধর্ষণটাকেই হালাম (বৈধ) বানিয়ে দিয়েছেন।
পশ্চিমা দেশগুলোতে মেয়েরা হাফ প্যান্ট ও শার্ট আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র ব্রা আর প্যান্টি পরিধান করে বাসায়, কর্মক্ষেত্রে ও রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কই, কেউ তো তাদের দিকে ফিরে ও তাকাচ্ছে না। কোন প্রকার মন্তব্যও করছেনা। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে গেছে আমাদের দেশেই।

ওইসব ধর্মান্ধরা কি একবারও ভেবে দেখে না যে, ধর্ষণের জন্য যদি পোশাকেই দায়ী হবে, তাহলে শিশুরা কেন ধর্ষিত হবে? মাদ্রাসা ও মক্তবে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কেন ধর্ষিত হবে? কোরআনে হাফেজ মেয়ে কেন ধর্ষিত হবে? কোরআনে হাফেজ মেয়ে তো মোটা কাপড়ের ঢিলাঢালা বোরখা পরিধান করেছে, হাতে ও পায়ে মোজা লাগিয়েছে। ধর্ষণের জন্য যদি নারীর পোশাকেই দায়ী হয়, তাহলে ওই কোরআনে হাফেজা মেয়ে ধর্ষিত হল কেন? সে তো ছোট পোশাক পরিধান করে তার দেহের অঙ্গভঙ্গি পুরুষের সামনে প্রকাশ করে নাই। তাহলে কেন ধর্ষিত হল সে, মৌলবাদীদের কাছে জবাব চাই।

যেসব আলেম ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করছেন, আমি তাদের আলেম বলতে নারাজ। কারণ আলেম তো তাদেরকেই বলা হয়, যারা ধর্মের প্রতিটা বিষয় সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেন! মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন ও হাদিসের কোথায় লেখা আছে যে, যদি কোনো নারী হিজাব বা পর্দা না করে তাহলে তাকে ধর্ষিতা হতে হবে, কিংবা তাদের ধর্ষণ করতে হবে। কোরআন হাদিসে বলা হয়েছে মুসলিম নারীরা যেন হিজাব বা পর্দা ব্যবহার করে। যদি কোনো নারী হিজাব বা পর্দা ব্যবহার না করে, তবে তাকে ধর্ষণ করার কথা ধর্মের কোথাও বলা হয় নাই। তাহলে তারা ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করে ধর্ষককে ধর্ষণ করতে উৎসাহিত করছে কেন?

আমি ওইসব নামধারী আলেমদের বলছি, সব নারীই কিন্তু ছোট পোশাক পরিধান করেনা। আবার সব নারীই কিন্তু হিজাব ব্যবহার করেনা। তারপরও কিন্তু ধর্ষিত হচ্ছে সবাই। শুধু কি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাই ধর্ষিত হচ্ছে? না, মাদ্রাসার হিজাব ব্যবহারকারী ছাত্রীরাও ধর্ষিত হচ্ছে। এমনকি মক্তবে কোমলমতি ছোট ছোট ছাত্রীরাও ধর্ষিত হচ্ছে। এখন কি বলবেন আপনারা?

অপরাধ করা এবং অপরাধীকে অপরাধ করতে উৎসাহিত করা সমান অপরাধ। তাই যারা পোষাকের কারণে বা অন্য কোনো কারণে ধর্ষণকে বৈধতা দিচ্ছে, ধর্ষককে ধর্ষণ করতে উৎসাহ দিচ্ছে, তারাও ধর্ষকের মত সমান অপরাধী। আলেম ভাইদের উদ্দেশ্যে বলছি, না বুঝে কোনো কমেন্ট করে আপনারা অপরাধীদের অপরাধ করতে উৎসাহিত করবেন না।

ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়ঃ
আইন করে কখনো ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না। তাতে যত কঠোর শাস্তির বিধানেই করা হোক না কেন। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, তাহলে কি আমাদের দেশে ধর্ষণের মত মহামারি ব্যাধি বন্ধ করা সম্ভব হবেনা? অবশ্যই সম্ভব হবে। তবে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদেরকে খোজে বের করতে হবে বিকৃত মানসিকতার ধর্ষকের মস্তিস্কএতোটা বিকৃত হওয়ার কারণ কি! কেন তার মস্তিস্কের এতোটা বিকৃত হল? সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলো যদি আপনারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন, ধর্মগুরুর কাছে তার ভক্ত ধর্ষিত হয়েছে, শিক্ষকের কাছে তার ছাত্রী ছাত্রী ধর্ষিত হয়েছে, বাবার কাছে তার মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, চলন্ত বাসে বা ট্রেনে যাত্রী ধর্ষিত হয়েছে, গৃহকর্তার কাছে কাজের সেই ছোট মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছে। এসব ধর্ষণের ঘটনাগুলো হুবুহু চটির গল্প ও পর্ণ ভিডিও’র বাস্তব চিত্র। এতে বুঝা যায় ধর্ষক নারীর দেহে আধুনিক পোশাক দেখে তাকে ধর্ষণ করতে প্রভাবিত হয় নাই। ধর্ষক প্রভাবিত হয়েছে বা হচ্ছে চটির গল্প পড়ে ও পর্ণ ভিডিও দেখে। পর্ণ ভিডিও ও চটির গল্পের হাজার হাজার সাইড ইন্টারনেটে রয়েছে। এছাড়াও মেমোরি লোড দেওয়ার দোকানগগুলোতেও রয়েছে হাজার হাজার পর্ণ ভিডিও। যে চটির গল্প ও পর্ণ ভিডিওতে শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ করছে, বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করছে, ধর্মগুরু তার ভক্তকে ধর্ষণ করছে, গৃহকর্তা তার বাসার কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করছে, চলন্ত বাসে যাত্রীকে ধর্ষণ করছে, এমনকি ছেলে হয়েও ছোট ছোট ছেলেদের ধর্ষণ করছে। আর পর্ণ ভিডিও ও চটির গল্পের এসব কাহিনীগুলোই বাস্তবে আমাদের দেশে অহরহ হচ্ছে।

যদি কোনো পুরুষের সামান্য যৌন চাহিদাও থেকে থাকে, আর সে যদি চটির গল্প পড়ে বা পর্ণ ভিডিও দেখে তাহলে তার মস্তিস্ক বিকৃত হবেই। এমনকি পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধ হলেও তার মস্তিস্কের বিকৃত হয়ে যায়, তখন মনুষ্যত্ব আর তার মাঝে কাজ করেনা। তখন সে ভুলে যায়, বাবা মেয়ের সম্পর্ক, শিক্ষক ছাত্রী সম্পর্ক। তখন তার মাঝে একটাই কাজ করে, শুধুমাত্র যৌন চাহিদা।

পর্ণ ভিডিও ও চটির গল্পের সাইডগুলো আমাদের দেশে ধর্ষণ শেখানোর প্রশিক্ষণ সেন্টার হিসাবে কাজ করছে। তাই সমাজ থেকে ধর্ষণের মত মহমারি ব্যাধি দুর করতে হলে, ধর্ষক তৈরির কারখানাগুলো আগে বন্ধ করতে হবে। আমার বিশ্বাস, পর্ণ ভিডিও ও চটির গল্পের সাইডগুলো যদি রাষ্ট্র বন্ধ করতে পারে, তাহলে দেশে ধর্ষণের হার ৯৫% কমে যাবে। ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এবং যারা বিভিন্ন ধরণের যুক্তির মাধ্যমে ধর্ষকের পক্ষে নিচ্ছে তাদেরকেও ধর্ষকের সমান শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে বাকি ৫% ধর্ষণও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমার এই লেখাটি ৩০ এপ্রিল ২০১৮ সালে ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল।

17 thoughts on “ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়”

  1. হতে পারে কোনো একজন আলেম এরকমটা করেছেন। তাই বলে কি আপনি সব আলেমকে এক পাল্লায় মাপবেন??

    Reply
  2. ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার শাস্তি হয় ভয়াবহ

    Reply
  3. There is only one difference between good and bad people. Good people think everyone is as good as he is. And bad people think everyone is as bad as him. If you are a thief, all the people in the world think you are a thief.

    Reply
  4. লেখক পরিকল্পিতভাবে হুজুরদের অপমান করা হয়েছে

    Reply

Leave a Comment