পদ্মা সেতুর লাভ ক্ষতির হিসাব

একটা সেতু
একটা স্বপ্ন
যে স্বপ্ন লাখো মানুষের
যে সেতু লাখো মানুষের
সেতু নির্মাণ সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুততর হবে এই আশাই সবার। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি স্থাপনা। এটার প্রয়োজনীয়তা কোনো রাজনৈতিক দলই অস্বীকার করতে পারবেনা। রাজনৈতিক বক্তৃতায় অনেক অসত্য এবং গলাবাজি থাকতে পারে। কিন্তু দেশের সম্পদের জন্য গর্ববোধ এবং আনন্দ সবার। তাই দলবাজি, তেলবাজি, খুন-গুম, লুট ও দুর্নীতি সব কিছুকে একদিকে রেখে আমরা বলতে পারি, পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্নের সেতু।

রাতের আলোতে পদ্মা সেতু। ছবিঃ সংগৃহীত

পদ্মা সেতুর লাভ ও ক্ষতির হিসাব:

উত্তাল পদ্মার বুকে সেতু হয়েছে। যাতায়াত সহজ হবে, অর্থনীতি প্রবৃত্তি বৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি, নির্মানকালী নানা ধরণের প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে। পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় এটি প্রতিষ্ঠিত যে, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিবেচনায় এটি এই অঞ্চলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পদ্মা সেতু নিয়ে বেশকিছু সংবাদ পড়ছিলাম গত কয়েকদিন যাবত। সংবাদ মাধ্যমগুলো পদ্মা সেতু নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে আমি বেশ কিছুটা চিন্তিত। কারণ আমাদের বাংলাদেশে সেতু মানেই নদীর বুকে চর, নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হওয়া। এখন পর্যন্ত এ দেশে একটি সেতুর উদাহরণ দেওয়া যাবে না, যা নদীবান্ধব হয়েছে বা নদীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সবগুলো প্রকল্প নদীর গলা চেপে ধরতে চেয়েছে।

পদ্মা নদী হল একটি খরস্রোতা নদী। খরস্রোতা নদী হিসাবে পৃথিবীতে এ্যামাজানের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পদ্মার নাম। খরস্রোতা পদ্মায় সেতু বানাতে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আলোচনা যেভাবে শুরু করেছিলেন, পত্রিকাগুলোতে তাদের কিছু বক্তব্য পড়ে পদ্মার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার বিকল্প নেই। নিমার্ণের সাথে জড়িত কেউ বলছেন, ভাল শাসন করেছি, জেদ ছেপেছে, জেদ থেকে ….. করেছি। এ বাক্যগুলো পদ্মার সাথে যায় না। কারণ পদ্মা নদী শুধু ভাঙ্গতে জানে না। পদ্মা নদী এই দেশের মানুষের জন্য আর্শিবাদ। পদ্মা নদী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। পানির অন্যতম জোগানদাতা, দেশের কৃষি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মৎস সম্পদ, লবণাক্তা বৃদ্ধিরোধ, মরুকরণ থেকে রক্ষায় পদ্মা ভূমিকা মাথায় নিয়ে পদ্মা সেতুর আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল।

পদ্মা সেতু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এত এত আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত সমীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমেগুলোতে তেমন আলোচনা নেই। কিন্তু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পদ্মা সেতুর চেয়েও দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে পদ্মা নদীর গুরুত্ব অনেক বেশি। পদ্মা সেতুর হাজার বিকল্প আছে বা থাকতে পারে। যে কারণে মানুষকে ঢাকা মুখী হতে হয় তা দক্ষিণ অঞ্চলে সহজেই নিয়ে যাওয়া যায়।

পদ্মা সেতুর বিপরীতে অন্য কি বিকল্প ছিল, তা নিয়ে তেমন কোন আলোচনা হয়নি। যতটা বলা হচ্ছে যে, দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। কিসের পরিবর্তন? ঢাকা কেন্দ্রিক সব গন্তব্যই কি ভাগ্যের পরিবর্তন? পদ্মা সেতু কি আবারও ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিয়েছে? পদ্মা সেতুর টাকা দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করলে হাজারগুণ বেশি অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব হতো। ঢাকা কেন্দ্রীক উন্নয়নের বিকেন্দ্রিকরণ হতো। পরিবেশ ও নদীবান্ধব উন্নয়ন হতো।

ছবিতে পদ্মা সেতু। ছবিঃ সংগৃহীত

পদ্মা সেতু নিয়ে এধরণের আলোচনা শুরু করা হয়নি। এ দেশের নদীর ভূমিকা শুধু কাগজে বা মুখে বললেই হবে না। ভৌগলিক কারণে নদীর অস্তিত্ব কোনভাবে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের উন্নয়নবাদের তত্ত্ব ও প্রযুক্তিজ্ঞানে নেই। এটা মনে রাখতে হবে। পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা দিয়ে পদ্মার উপরে সেতু নির্মাণের বিরুপ প্রভাব আগামীতে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গে বা সারাদেশে কি প্রভাব ফেলে তা দেখার বিষয়।

একটি খরস্রোতা নদীর উপরে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা দেয়ার প্রভাবে আজকের অনেক অর্জন হয়তো তখন বিস্বাদ হবে। আমাদের যদি ব্যাপক আলোচনার সুযোগ থাকতো, তাহলে হয়তো আমরা সিদ্ধান্ত নিতেই পারতাম যে, পদ্মা নদীতে সেতু চাই নাকি দক্ষিণবঙ্গে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ চাই?

একদিকে চলছে বন্যার্ত মানুষের আহাজারি অন্যদিকে চলছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

সুনামগঞ্জ ও সিলেট এই দুই জেলার অন্তত ২০টি উপজেলায় বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ৪০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। বাড়িঘর ডুবে যাওয়ার তাদের অনেকে আশ্রয় নিয়েছে ঘরের চালা কিংবা কলার ভেলায়। অনেক এলাকায় পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘরের ধান-চাল, আসবাব, গবাদিপশু। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট। বানের পানিতে কোনোমতে ভেসে থাকা মানুষ উদ্ধারের আর্তি জানাচ্ছে। আবার অনেক এলাকার কোনো তথ্যও মেলেনি তিন দিনে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় কেউ কারও খোঁজ নিতে পারছে না।

বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ঘর-বাড়ী। ছবিঃ সংগৃহীত

স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সিলেট বিভাগে এবার যে বন্যা চলছে বাংলাদেশ ভূখন্ডে এমন ভয়াবহ বন্যা দেখা যায়নি ১২২ বছরেও। সিলেট বিভাগের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ার উজানের ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যেও রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ভয়াবহ বন্যায় বন্যার্ত মানুষেরা সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছে। তবে, পর্যাপ্ত খাদ্য আছে, কিন্তু খাদ্য পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি জনপ্রতিনিধিদের।

কি এমন ক্ষতি হতো যদি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হতো?

প্রতিদিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে বন্যার্ত মানুষের আহজারি ও তাদের অসহায়ত্ব কথা, সহায় সম্বল হারিয়ে সড়কে, বাঁধের উপরে, স্কুল-মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া মানুষের অসহায়ত্বের কথা। শিশু সন্তান, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে নিয়ে অভুক্ত থাকা মানুষের কথা। এই বিষয়গুলো কি আওয়ামিলীগ সরকারকে চিন্তিত করে না?

বন্যার পানিতে প্লাবিত ঘর। ছবিঃ সংগৃহীত

আজ ২৫ জুন ২০২২ ইং পদ্মা সেতু উৎসব। দেশের মানুষের এমন বিপদের মূহুর্তে আওয়ামীলীগ সরকার মেতেছে পদ্মা সেতুর জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজনে। পদ্মা সেতু অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিরাট বড় একটা অর্জন। কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে অবশ্যই বড় নয়? লক্ষ লক্ষ বন্যার্ত মানুষের কষ্টের কথা ভেবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের তারিখ কি পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না? পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠান কিছুদিন পরে কি করা যেতো না?

2 thoughts on “পদ্মা সেতুর লাভ ক্ষতির হিসাব”

  1. আমার মনে হয়, আপনি সঠিক কথাটিই বলেছেন

    Reply

Leave a Reply to এস. এম. মাহবুব Cancel reply