প্রেম করবি তো মরবি

প্রেমের জন্য প্রাণ দেওয়ার গল্প-কাহিনী শুধুমাত্র আমার কল্পনাপ্রসূত নয়, সাহিত্যের পাতায়ও জায়গা করে নিয়েছে তার বাস্তবতা থেকেই। এর পক্ষে ইতিহাসেও ভূরি ভূরি সাক্ষ্য মিলে। কিন্তু আজকের দিনের বাস্তবতা যেন ঠিক তার উল্টো। প্রেমের জন্য প্রাণ দেওয়া তো দুরের কথা, বরং প্রেমের ফাঁদ পেতে প্রেমিকার গলায় ফাঁস পরোনোর বন্দোবস্ত করাই যেন ‘প্রেমিকের’ মূল লক্ষ্যবস্তুু। দেশে ডিজিটাল ‘মারণাস্ত্র’ হাতে এই শ্রেণির প্রেমিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যতটা জানতে পেরেছি, তা ভয়াবহ পরিস্থিতিরই জোরালো ইঙ্গিত দেয়।

তথাকথিত ভন্ড প্রেমিকদের পকেটে থাকা ‘মারণাস্ত্র’টির কার্যকারিতা বলা যায় একমুখী। কেবলমাত্র নারীকেই টার্গেট করা প্রাণঘাতী এই অস্ত্রটির নাম হলো ‘মোবাইল ফোন’। নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বিকৃত কাম-বাসনা, সর্বোপরি সমাজলালিত পৌরুষের ভ্রান্ত ধারণায় সত্যিকার অর্থেই প্রযুক্তির এ আশীর্বাদ যেন নারীর জন্য আজ অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

প্রেমের ফাঁদ পেতে কাছে টেনে নিয়ে নিজেদের একান্ত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করতে পারলেই এই ভন্ড প্রেমিকদের স্বার্থ হাছিল হয়ে যায়। এবার ইচ্ছামতো প্রেমিকাকে ‘ব্যবহার করা সহ অর্থকড়ি আদায়ের পথ খুলে যায় তাদের জন্য। প্রেমিকারা ফাঁদে পা না দিলেও বিকল্প আছে ভন্ড প্রেমিকদের কাছে। গোপনে কোনো এক সময়ের ভিডিও বা ছবি তোলার জন্য ওত পেতে থাকে তারা। একদিন না একদিন সেই উদ্দেশ্য হাসিলও হয় তাদের। ব্যাস, সেই ভিডিও বা ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যা খুশি তাই করার ‘লাইসেন্স’ পেয়ে যায় ভন্ড প্রেমিকেরা।

যা খুশি তাই করার লাইসেন্স পেলে ভন্ড প্রেমিকদের এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রে চেয়েও অধিক ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠতে দেখা যায়। এটি কেবলমাত্র ভুক্তভোগী মেয়েদের প্রাণই কেড়ে নেয় না, তার মান-সম্মানও মাটিতে মেশায়। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের জীবনও হয়ে ওঠে নরকের মতো। সসম্মানে বেঁচে থাকা তাদের জন্য তখন সম্পুর্ণ হারাম হয়ে যায়

৪ জুলাই ২০২১ সালে রাজধানীর বাসাবোতে ১৪ বছরের এক স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন জানা গিয়েছিল, এলাকারই এক ছেলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিও প্রচারের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে আসছিল। দফায় দফায় টাকা আদায়। আরও টাকা চাই তার। দিতে না পারায় ভিডিও ফাঁস, তারপরে মেয়েটিরও গলায় ফাঁস।

৫ জুলাই ২০২১ সালে বরগুনার ১৩ বছরের এক স্কুলছাত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করল। চিরকূটে সে লিখে গেলো, ‘মা, আমার নামে তারা যে বদনাম উঠিয়েছে, তাতে আমি এ পৃথিবীতে থাকতে পারছি না। আমি একটা খারাপ মেয়ে। আমি নাকি খুব খারাপ। আমাকে কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ না, একমাত্র তুমি ছাড়া।’ কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কুৎসা রটিয়ে বেড়ায় বাড়ির মালিকের ছেলে। সমাজও তার কথা লুফে নেয়। নারীর বিরুদ্ধে যৌন সুড়সুড়ি জাগানো আলাপে ভাগিদার হওয়া মানুষের সংখ্যা কোনোও কালেই কম ছিল না।

ছবিঃ সংগৃহীত

গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে প্রেমিকের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ভাইরাল হওয়ায় মাদারীপুরের শিবচরে ১৭ বছরের এক ছাত্রী কীটনাশক পানে নিজের জীবনের ইতি টানে। কে তার অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ছবি ছড়িয়ে দিয়েছিলো? স্বয়ং তার প্রেমিক। কী অদ্ভূত ব্যাপার। দুজনের ছবি প্রকাশ পেলো। অথচ একমাত্র মেয়ের মৃত্যু ভিন্ন অন্য কোনো গতি নেই। কিন্তু প্রেমিক পুরুষটিকে মরতে হয়না। সে না মরেও সমাজের কাছে হয়ে ওঠে ‘হিরো’।

প্রেমিকাকে ‘নিজের হাতে মেরে ফেলা’র দুই মাস পর নিজেদের একান্ত সময়ের ভিডিও ফাঁস করার নজির গড়েছে রংপুর বদরগঞ্জের এক ভন্ড প্রেমিক। প্রেমের ‘নাটক’ করে দিনের পর দিন মেয়েটিকে ধর্ষণ করে সে। বন্ধুকে দিয়ে গোপনে সেসব মুহূর্তের ভিডিও করান। একসময়ে মেয়েটি বিয়ের কথা বলতেই ফোঁস করে ওঠে সে। নিরুপায় মেয়েটি নিজের জীবন কেড়ে নেওয়াকেই ‘সহজ’ সমাধান ভেবে আত্মহত্যা করে। কিন্তু তার প্রেমিকটি কিন্তু অতটা সহজ ভাবনার নয়, সে অন্য ধাতুতে গড়া এক পাষাণ। মৃত্যুর পরও মেয়েটিকে অপমানিত, লাঞ্ছিত করার সাধ তার যায় না। ছড়িয়ে দেয় মেয়েটির সাথে অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ভিডিও। এবং বলাই বাহুল্য, নিজের পৌরুষেরও বিজ্ঞাপন হয়ে যায় তাঁর! এখানেই শেষ নয়, প্রভাবশালী প্রেমিক পুরুষটির হুমকি-ধমকিতে মেয়েটির অসহায় মা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতেও বাধ্য হন। ইউপি সদস্যের ছেলে বলে কথা গো।

ছবিঃ সংগৃহীত

ওহে মেয়ে, প্রেমে পড়লি তো তুই মরলি! প্রেমে না পড়লেও তুই মরবি। খাগড়াছড়ি দীঘিনালার কলেজছাত্রীর অপরাধ ছিল প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়া। ব্যস, রাস্তায় তিনজন মিলে মেয়েটিকে মারধর করেন এবং যথারীতি এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেন। দুনিয়ায় নরক ভোগ করার চেয়ে পরকালের নরকে যাওয়াকেই বেছে নেয় মেয়েটি! ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে প্রকাশ্যে রাস্তায় নির্যাতিত হয় মেয়েটি। রাতে সবার অগোচরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করে সে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে (মাসে, তারিখটা আমার মনে হচ্ছে না) সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ফটোশপের মাধ্যমে নগ্ন দেহের সঙ্গে এক কিশোরীর মুখ লাগিয়ে ছড়িয়ে দেন ‘প্রেমপ্রত্যাশী’ এক তরুণ। ভুক্তভোগী মেয়েটির পরিবার পুলিশেরও দারস্থ হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো প্রতিকার মেলেনি। তারপর আত্মহত্যা করে ভুক্তভোগী মেয়েটি।

উদাহরণ দেয়ার মতো এরকম হাজার হাজার ঘটনা আছে। প্রতিকারের হিসাব করে শেষ করা যাবে না। প্রভাবশালীদের হুমকি-ধমকি, সালিস বৈঠকের প্রহসন, নেতা ফেতা আর মাতব্বরের নিদান এবং সর্বোপরি নিপীড়ক, ধর্ষকের আস্ফালন। এর বিপরীতে লোকলজ্জা, অপমান, সামাজিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, এমনকি একঘরে বা সমাজচ্যুত হতে হয় ভুক্তভোগী মেয়েসহ পরিবারকে। কিছু ক্ষেত্রে মামলা হলেও নিষ্পত্তির সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনার মতো। অতএব নানাভাবে প্রশ্রয়-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে দাপিয়ে বেড়ান ‘প্রেমিক’ নামের বখাটে, লম্পট। প্রেমের নামে নারীর নিগৃহীত-নিপীড়িত হওয়া তাই যেন ‘নিয়তিই হয়ে গেছে। কেউ কেউ আত্মহত্যা করে বাঁচছেন! বাকিরা বয়ে বেড়াচ্ছেন মানসিক ক্ষত, বৈকল্য। অসম্মানের জীবন।

Leave a Comment