বাংলাদেশও কি শ্রীলঙ্কার পথেই এগুচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিজের পরিবারের গল্প ও বিশ্ব ব্যাংকের মিথ্যা অভিযোগের কথা বারবার বলছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন কিছু নেই। বিশ্ব ব্যাংকের আনীত দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি হয়েছে কিনা, সেই ব্যাপারটা সচেতন জনগণের কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত। কারণ দিনশেষে এই টাকাগুলো জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে।

সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম, বাংলাদেশের রিজার্ভ নাকি ৩৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। করোনা ভাইরাস, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশিক মন্দা ভাব, রেমিটেন্স কমে যাওয়া (অর্থাৎ) সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটা ডাল-চালের খিচুড়ির মতো।

এখানে মজার বিষয় হলো, যেই বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগকে পাত্তা না দিয়ে, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে “নিজস্ব অর্থায়ন, নিজস্ব অর্থায়ন” বলে প্রচুর ঢোল সরকার পিটিয়েছে, আর এখন সেই বিশ্ব ব্যাংকের কাছেই এক বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সুদের টাকাও প্রচুর বাড়ছে। যারফলে রিজার্ভের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ বাবত। এর পাশাপাশি রয়েছে আমদানিও।

ক্রমবর্ধমান হারে আমদানি পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমদানির তুলনায় রফতানি বাড়ছে না। যারফলে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। চলতি বছরেই আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে ৮০-৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌছাতে পারে। কিন্তু রপ্তানি ৪৫-৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সরকারকে এই ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ করতে হবে রেমিটেন্স দিয়ে। তবে শুধুমাত্র রেমিটেন্স দিয়ে এই বাণিজ্য ঘাটতি পুরণ না-ও হতে পারে। এই ঋণ আর বাণিজ্য ঘাটতি সমস্যা দুটির সঙ্গে যোগ হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি।

বৈদেশিক ঋণের বোঝা আর বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির কারণে অনেকেই মনে করছেন বাংলাদেশও শ্রীলঙ্কার পরিণতি ভোগ করতে পারে। গত দশ মাসে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। আগামী মাসগুলোতে এই রিজার্ভ আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি রপ্তানির বিপরীতে আমদানি প্রবণতা অব্যাহত থাকে আর সরকার রেমিট্যান্সের মাধ্যমে এই প্রবণতা কমাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগামী মাসগুলোতে বিপদজনক স্তরে নেমে যাবে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো ব্যয়বহুল ও অলাভজনক প্রকল্পে কড়া সুদে বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। ওইসব ব্যয়বহুল ও অলাভজনক প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ব্যয়বহুল ও অলাভজনক প্রকল্প থেকে আয়ের ঘাটতির কারণে যথাসময়ে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থও হতে পারে। আবার সরকার যদি সময় বিলম্ব ও বাড়তি খরচ ছাড়া ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে এই ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর জন্য সরকার যে ঋণ নিয়েছে তা সময়মতো পরিশোধ করতে পারবে।

শ্রীলংকার দুর্নীতিপরায়ন প্রেসিডেন্ট রাজা পাকসে। ছবিঃ সংগৃহীত

রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী দিনে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়বে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ সরকার ৬১.৫২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। অর্থাৎ, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ৪৩.৮৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে রপ্তানি সেই কচ্ছপের গতিতেই (৩২.৯২%) বেড়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম মূল উৎস বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স। আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালের প্রথম চার মাসে প্রায় ২০% কমে ৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে৷

রপ্তানি, রেমিট্যান্স, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আয় ও ব্যয় বাড়ার সুযোগে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, এমনকি বিদেশি সাহায্যের অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো হওয়ায় বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আমদানি বৃদ্ধি, সঠিক পরিকল্পনা না করে ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ, প্রবাসী আয়ে ভাটা, ব্যাপক দুর্নীতি, আর রাজনৈতিক অপশাসনের কারণে যেকোনো অঘটনের আশঙ্কাকে আবার সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট আমাদের মাঝে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সঞ্চার করেছে।
দেশে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ সরকার জনগণকে অর্থ ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকার ব্যয় কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাঁচাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত করা হয়েছে এবং কিছু অলাভজনক প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। যে কাজগুলোর জন্য অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করতে হতো।

এখন পর্যন্ত সংবাদপত্রের মাধ্যমে যা জানা যাচ্ছে, তাতে মনে হয়, বাংলাদেশে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় রয়েছে, এভাবে চললে তা দিয়ে আর কিছুদিন চলা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে বিশ্ব বাজারে জিনিসের দাম আরও বাড়লে আরও দ্রুত জমানো অর্থ ফুরিয়ে গিয়ে খারাপের দিকে মোড় নিবে পরিস্থিতি। এমতাবস্থায় কী অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের ভাগ্যে? এই সঙ্কট কি কাটিয়ে আবারও শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবে বাংলাদেশের অর্থনীতি? নাকি অদূর ভবিষ্যতেই আবারও এক শ্রীলঙ্কার পুনরাবৃত্তি দেখতে চলেছে বিশ্ব? সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment