বাজেটে পাচারকারীর সুযোগ থাকছে বারবার

জিএফআই এর গবেষণা মতে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। এসব তথ্য আপামরসাধারণের জানা থাকলেও অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলছেন, তার জানা নেই। অথচ একদিকে বলছেন অর্থপাচারের ব্যাপারে তার জানা নেই, অন্যদিকে পাচারকৃত অর্থের বৈধতা দিয়ে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদ থেকে বিল পাস করছেন। আমি অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে জানতে চাই, আপনি জানেনই না দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয় কি-না! তাহলে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদ থেকে বিল পাস করছেন কেন? অর্থমন্ত্রী মহোদয়, আর কত ”জানিনা জানিনা” বলবেন? কিছু জানুন, জানার চেষ্টা করুন, তাহলে দেখবেন, দেশের অবৈধ সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে। অপরাধীদের এইভাবে আর ছাড় দিতে হবেনা।

প্রতিটি বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো দিক রয়েছে। তবে এবারের বাজেট একটু ভিন্ন হওয়ার কারণ হচ্ছে পাচারকৃত অর্থকে বৈধতা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখার জন্য। গত ১০ জুনে, বাজেট অধিবেশনের বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশে স্থাবর সম্পত্তি থাকলে দেশের আয়কর রিটার্নে দেখাতে চাইলে ১৫ শতাংশ আয়কর দিতে হবে। অস্থাবর সম্পত্তির ওপর ১০ শতাংশ, পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনলে ৭ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে দেখাতে পারবেন যে কেউ। এ বিষয়ে তাকে (অবৈধভাবে অর্থপাচারকারীকে) কোনো প্রশ্ন করা হবে না এবং তার বিরুদ্ধে সরকার কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিবে না।

দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের আপামর জনগণের টাকা মেরে যারা বিদেশে পাচার করেছে বা করছে, তারা অপরাধী। শাস্তিই তাদের একমাত্র প্রাপ্য। সামান্য কয়েকটা টাকার বিনিময়ে তাদের দায়মুক্ত করে দেয়া মানে হলো জনগণের সাথে প্রতারণা করার শামিল। যারা দেশের আপামর জনতার কষ্টের উপার্জিত টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে, তারা অসৎ। আর অসৎ লোকের কাছে সততা আশা করার মানে হলো শিয়ালের কাছে জীবন্ত মোরগ বন্ধক দেয়ার মতো।

সুইস ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশিদের বিপুল পরিমাণ অর্থের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। যা দেখে বিস্মিত হয়েছে দেশবাসী। মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে অবৈধভাবে পাচারকৃত টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ৫৫ গুণ বেশি। এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, কিভাবে এই বিপুল পরিমাণ টাকা সুইস ব্যাংকে নিয়ে যাওয়া হলো? বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এই বিপুল পরিমাণ টাকা তো বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই! তাহলে কিভাবে নিয়ে যাওয়া হলো টাকাগুলো? সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের অবৈধ এই বিপুল পরিমাণ টাকার শেষ পরিণতিই-বা কি হবে?

জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ছবিঃ সংগৃহীত

৭ শতাংশ কর দিয়ে শুধুমাত্র দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ-ই হালাল হবেনা, হালাল হবে এই অবৈধ অর্থ পাচার করে যারা বিদেশে স্থাবর অস্থাবর বেগমপাড়া গড়ে তুলেছেন। পাচারকৃত টাকায় বিদেশে ক্রয় করা সম্পত্তি দেশে না নিয়েও পাচারকারীরা সরকারের বৈধতার সনদ পেয়ে যাবে। বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পত্তির জন্য ১৫, অস্থাবর সম্পত্তির জন্য ১০ শতাংশ কর দিলেই সবকিছু হালাল হয়ে যাবে। সরকারের এই বিশেষ ব্যবস্থায় বলা হয়েছে, পাচারকারীদের শুধুমাত্র দেশেই নয়, বিদেশেও দায়মুক্তি দেবে সরকার। যারফলে পাচারকারীরা সরকারের কাছ থেকে হালাল সম্পদের সনদ পেয়ে যাবে। কর না দিয়েও কিছু কিছু পাচারকারীরা জাল সনদ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে এ আর তেমন কঠিন কিছু নয়।

১০ শতাংশ কর দিয়ে যদি এই বিপুল পরিমাণ টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা যেতো, যা অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে, তাহলে না-হয় অর্থমন্ত্রীর এই অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া যেতো। কিন্তু তা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ অবৈধভাবে অর্থপাচারের অতীত রেকর্ড কিন্তু তা বলেনা। কারণ, ১০ শতাংশ কর দেওয়ার মাধ্যমে অতীতে সরকার কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ দিয়েছিল ১৮ বার। এই ১৮ বার সুযোগ পাওয়ার পরেও কালোবাজারীরা সুযোগকে কাজে লাগায়নি। পাচারকৃত অর্থের ব্যাপারেও ভালো কোনো পাওয়া যাবে বলে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পরিশেষে বলবো, অর্থপাচারকারীদের অনৈতিক কোনো সুযোগ না দিয়ে, অর্থপাচার কিভাবে চিরতরে বন্ধ করা যায়, সেই পথ খুজে বের করাই উত্তম হবে। অর্থ পাচারকারীদের এইভাবে সুযোগ দিলে দেশের সৎ উদ্যোক্তা ও করদাতাদের অনুৎসাহিত করা হবে। যেই অর্থ দেশ থেকে একবার বেরিয়ে যায়, সেই অর্থ ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।

Leave a Comment