বিজয়ী মেয়েদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দল vs নেপাল জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের ফাইনাল খেলাটি আমি দেখেছি। নেপালের কাঠমান্ডুতে দশরত স্টেডিয়ামে, নেপালি দর্শকদের নেপাল নেপাল চিৎকার আর বাশির শব্দে নেপালি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেমিফাইনাল পর্যন্ত একটি গোলও না খাওয়া বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দল সেই নেপালিদের আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

৩-১ গোলে জয়ী হয়ে প্রথম বারের মত ইতিহাস গড়েছে আমাদের দেশের নারী ফুটবল দল। নারী ফুটবল দলের এই বিজয় আমাদেরকে গর্বিত করেছে। বিশ্ব দরবারে আমাদেরকে সম্মানিত করেছে। তাই এই বিজয় নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই দেশবাসীর। নেপালে ইতিহাস গড়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখে বিজয়ী মেয়েরা। বিজয়ী মেয়েদের স্বাগত জানিয়ে সাদরে বরণ করতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের পদচারনায় লোকে লোকারণ্য ছিল বিমানবন্দর এলাকা।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দল। ছবিঃ সংগৃহীত

ছেলে ফুটবল খেলোয়াড়েরা তাদের কাজকর্মে কখনো এতদূর আসতে পারেনি। যদিওবা আশির দশকে আমাদের ফুটবল টিম বিশ্বে কিছুটা ভালো জায়গা করে নিয়েছিল। তাই এখন তারা উদ্ভট কথাবার্তার মাধ্যমে তাদের কাজে আচরণে বেশ হাস্যরসের যোগান দিয়ে গণমাধ্যমে মাঝে মধ্যে উঁকি দেয়। আমি উদাহরণস্বরূপ বলছি বাহরাইনের এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ যুবা চ্যাম্পিয়নশীপের কথা।

এএফসি যুবা চ্যাম্পিয়নশীপের বাছাইয়ে কাতারের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল দল। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হওয়ায় দলের খেলোয়াড়দের মনে সাহস যোগাতে টিম ম্যানেজার বিজন বড়ুয়া খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, পদ্মা সেতু বানাতে পারলে কাতারকে হারাতে পারব না কেন? কিসের সাথে কি, আর পান্তা ভাতে ঘি! যদি অর্থায়নের উৎস থাকে তাহলে এইরকম সেতু হাজারটা বানানো যায়। অর্থায়নের ব্যবস্থা হয়েছে তাই সেতু বানানো হয়েছে। বিজন বড়ুয়ার কাছে আমার প্রশ্ন রইল, এই অর্থ দিয়ে কাতারকে পরাজিত করতে পারলেন না কেন? বা বাংলাদেশ ফুটবল দল কাতারের কাছে শোচনীয়ভাবে হারলো কেন?

আমি বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের এই বিজয়ের সম্পূর্ণ ক্রেডিট দিব ম্যানেজার গোলাম রব্বানী ছোটনকে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের এই ম্যানেজারকে একবার জাতীয় দলের দায়িত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে।

বহু বছরের চেষ্টার পরে জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সাফল্য এসেছে। তাই অবহেলিত আর অন্ধকারে থাকা দল আলোতে এসেছে। ফুটবলারদের বেঁড়ে উঠায় বাস্তবতার স্পর্শ পেয়েছে। তারা সংগ্রাম করেছে, তাই তারা টিকে থেকেছে। এমনকি তারা এতো ভালোভাবে টিকে থেকেছে যে, সাফের প্রতিটা ম্যাচের রেজাল্ট-ই তার স্পষ্ট প্রমাণ।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দল। ছবিঃ সংগৃহীত

আমি সম্পূর্ণ লাইভ প্রোগ্রামটিই ভালোভাবে দেখেছি। আমাদের মেয়েরা অসাধ্যকে সাধন করেছে। কি দুর্দান্ত খেলাই না খেলেছে মেয়েরা। পুরো টুনামেন্টে গোল খেয়েছে মাত্র একটি। আর গোল দিয়েছে ২৩টি। আমরা যখন মেয়েদের খেলার জাদু দেখেছি, তারা (মৌলবাদীরা) তখন শুধুই দেখেছে মেয়ে খেলোয়াড়দের উরু। তারা দেখছে আর কল্পনা করেছে যে, ইস!….. উরু! আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমাদের মেয়েদের এই বিজয়, মৌলবাদের বিরুদ্ধে বিরাট এক বিজয়।

দেশের সাধারন মানুষ বিজয়ী মেয়েদের সম্মান জানিয়েছে। মেয়েদের আপন করে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে এসে তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ভালোবাসা জানিয়েছে, সম্মান জানিয়েছে। আর এসবই প্রমাণ করে দেশের মানুষ আজ মৌলবাদীদের যাতাকলের বাহিরে।

অসাধ্যকে সাধন করা মেয়েদের এই বিজয়কে ধরে রাখতে হবে। বিজয়ের এই দ্বারা অব্যাহত রাখতে হবে। মহিলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের বেতনাদি বাড়িয়ে জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের সমান করতে হবে।

জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র থেকে উঠে এসেছে। এই মেয়েদের একটাই পরিচয়: তারা সবাই বাংলাদেশী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই মেয়েরাই সামান্য সুযোগ সুবিধা পেয়ে আজ দেশকে যে সম্মান এনে দিয়েছে, তা সত্যিই আনন্দের, গর্বের। এই মেয়েদের জন্য রাষ্ট্রের অনেক দ্বায়িত্ব রয়েছে।

Leave a Comment