ভয়াবহ লোডশেডিং: দায় কার?

বাংলাদেশে কয়েকদিন ধরে একটি আলোচিত বিষয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট। এবং এর ফলে সৃষ্ট মানুষের দুর্ভোগ। সরকারি দলের অনেক বড় বড় নেতারা অনেকটা গর্ব করেই বলতেন, লোডশেডিং-কে যাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে যাদুঘর থেকে লোডশেডিং-কে ফিরিয়ে আনা হলো কেন?

গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান যে, ১৯ জুলাই থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং থাকবে। তবে এ সূচি আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এ সময় ওই এলাকায় ১ থেকে ২ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের জন্য নামাজের সময় ব্যতিত প্রতিটি মসজিদের এসি বন্ধ এবং দোকানপাট ও মার্কেট রাত ৮টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ সময় সরকারি অফিসের সভাগুলো অনলাইনে পরিচালনা করতে হবে। সিএনজি পাম্পগুলো সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখা হবে।

বলা হয়েছে প্রতিটি এলাকায় প্রত্যেকদিন ১ থেকে ২ ঘন্টা লোডশেডিং থাকবে। কিন্তু আমাদের এলাকায় তো প্রত্যেকদিন ১৪ থেকে ১৫ ঘন্টা লোডশেডিং থাকছে। তবে ১৪ থেকে ১৫ লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার না করলেও, কোথাও কোথাও তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুতের লোড শেডিং হচ্ছে, স্বীকার করলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। সরকারি দলের নেতারা এতো ঢাকঢোল পেটালেন, সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খুশির ঠ্যালায় হাতিরঝিলে নাচলেন। এখন আপনাদের বিদ্যুৎ গেলো কোথায়?

একথা ঠিক যে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকগুণ বাড়িয়েছে। ২০১১ সাল থেকে গেল বছর পর্যন্ত দেশ থেকে লোডশেডিং শব্দটি প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে এখন আবার দেশে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ছেয়ে গেল কেন? হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দায় আছে। কিন্তু এর বাইরে কি আর কারোর কোনো দায় নেই?

বৈদ্যুতিক এতো প্রাচুর্যের মধ্যে আকস্মিকই বিদ্যুৎ খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা রকম নির্দেশ জারি করা হচ্ছে। নিয়ম করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ফল হিসেবে এমনটি হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। সরকারের এই যুক্তির বিরোধিতা করার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশে এত দ্রুত কেন এমন সংকট সৃষ্টি হলো, তার পেছনের অন্যান্য কারণগুলোও খুঁজে বের করা দরকার।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার কথা বলে যখন একের পর এক ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে থাকে; তখন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অনেকেই এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, বেশিরভাগই উচ্চমূল্যের ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক হওয়ায় এগুলোর উৎপাদন খরচ দেশের গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক বেশি। তাছাড়া বিনা টেন্ডারে এসব কেন্দ্র দেওয়া হয়েছিল ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের। বিশেষজ্ঞদের ওই সমালোচনা যে অমূলক ছিল না- দিন যত গেছে, ক্রমেই তা স্পষ্ট হয়েছে।

তারপরও সাধারণ মানুষ সরকারি উদ্যোগকে মেনে নিয়েছিল এ কারণে যে, তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কারণে অশেষ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না। আর অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী জ্বালানিভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র তথা ‘বেইজলোড প্ল্যান্ট’ নির্মাণ রাতারাতি সম্ভবও ছিল না। সরকারও তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- বেইজলোড প্ল্যান্টগুলো নির্মিত ও সচল হলেই ধাপে ধাপে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বেইজলোড প্লান্ট অপারেশনে আসায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও সরকার রহস্যজনক কারণে দফায় দফায় কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েই চলেছে।

পিডিবি যে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে কুইক রেন্টালগুলোর আয়ু বাড়াতে চাচ্ছে, তাতেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এর আগে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কুইক রেন্টালগুলোকে ৭০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের তুমুল সমালোচনা হওয়ায় পিডিবি বলছে, এখানে সেই ক্যাপাসিটি চার্জ নেই। বাস্তবে স্থির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ নামে একটা খাত যুক্ত করা হয়েছে, যার বাবদ সরকারকে গড়ে ৩ টাকা দিতে হবে, যেখানে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা। তা ছাড়া ‘পরিবর্তনশীল মেরামত ও পরিচালন ব্যয়’ আগে ছিল দশমিক ৫ পয়সা; এখন হয়েছে ২৫ পয়সা! ফলে কুইক রেন্টালের পেছনে সরকারের খরচ আগের তুলনায় বরং বাড়বে।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শীতকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসে, তখন নানা ভোঁতা যুক্তি দেখিয়ে খুবই সস্তায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সরকারি কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে উচ্চমূল্যের কুইক রেন্টালগুলো চালু রাখা হয়েছে। ২০১০ সালে যখন সচেতন মহলের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে এ কুইক রেন্টালগুলোকে আইনি ঝামেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ প্রভিশন) আইনটি প্রণীত হয়, তখনই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের আত্মিক সম্পর্কের বিষয়টি বোঝা গিয়েছিল।

তবে সরকারকে এটা বুঝতে হবে, পয়সার অভাবে আজ যখন জ্বালানি কিনতে না পারার কারণে দেশবাসীকে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং মেনে নিতে বলা হচ্ছে, ঠিক তখনই অপ্রয়োজনীয় কুইক রেন্টালের মালিকদের জনগণের পকেট কেটে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এটা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেই।

দেশে গ্যাস সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থাকলেও কমিশনভোগী এবং কিছু গোষ্ঠীকে লাভবান করতে গত এক দশকে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে। দেশিয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ ২০১৮ সালেও ছিল ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে কমে এসে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঠেকেছে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এলএনজির আমদানি। চাহিদা মেটাতে লং টার্ম এলএনজির পাশাপাশি বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকেও আমদানি করে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজির আমদানি বন্ধ রেখেছে পেট্রোবাংলা। তার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের ৫১ শতাংশ আসে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ থেকে। আমদানিনির্ভর গ্যাস খাত হওয়া সত্ত্বেও কেন সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান করছে না? জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা যদি ১০০ মিলিয়ন ডলার গ্যাস অনুসন্ধানে খরচ করার পর দেখি গ্যাস নেই, তাহলে এই ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?’

সরকারের অদূরদর্শিতার কারণে বছর বছর যে পরিমাণ টাকা গচ্চা দিচ্ছে, তা দিয়ে আরও ব্যাপক আকারে গ্যাস অনুসন্ধান করা যেত। গত দশ বছরে ষাট হাজার কোটি টাকারও বেশি গচ্চা দিতে হয়েছে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অসম চুক্তির কারণে। এই কেন্দ্রগুলো কোনো বিদ্যুৎ সরবরাহ না করেও সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এবং এখনও নিচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে চুরি, অপচয় ্র ব্যাপক দুর্নীতি। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গ্যাস অনুসন্ধানের টাকার কোনো অভাব হতো না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আমদানি করা জ্বালানির (কয়লা এবং ইউরেনিয়াম) উপর নির্ভর করে বৃহৎ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতিমধ্যেই উৎপাদনে শুরু করেছে। বোঝাই যাচ্ছে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ শক্তির প্রধান উৎস হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি ঝুঁকছে, বাংলাদেশ তখন আমদানি করা জ্বালানীর উপর নির্ভরশীল হচ্ছে! গত কয়েকদিনের লোডশেডিংয়ে এই নির্ভরশীলতাই শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে! ভবিষ্যতে কোনো কারণে জ্বালানী আমদানি ব্যাহত হলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যায়ে নির্মিত এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোনো কাজে আসবে কী?

রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের আদানি পাওয়ারের সংগে এক অপরিণামদর্শী চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশের। অপরিণামদর্শী বলার কারণ হলো, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশকে এক ইউনিট বিদ্যুৎ-ও দিতে পারবে না। কিন্তু তারপরও চুক্তির শর্তানুযায়ী ভারতের আদানি পাওয়ারকে টাকা পরিশোধ করতে হবে। ভারতীয় কোম্পানীটি এক ইউনিট বিদ্যুৎ না দিয়েও বাংলাদেশের কাছে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১২১৯ কোটি টাকা। চুক্তির ২৫ বছরের মেয়াদকালের মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে আদানি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ দিতে হবে বাংলাদেশকে, যা ৩টি পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য যথেষ্ট।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবিঃ সংগৃহীত

ক্যাপাসিটি চার্জ কী: বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের যাতে লোকসান না হয়, সে জন্য অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে বিনিয়োগকৃত অর্থ হিসাব করে একটি নির্দিষ্ট হারে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এ অর্থ পান উদ্যোক্তারা। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ কম বলে এগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ অনেক বেশি।

ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয় তার দক্ষতার ওপর। অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির সময় প্রকৃত দক্ষতার চেয়েও বেশি করে দেখানো হয়েছে। যাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি পায়। দক্ষতা কম থাকায় চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে উৎপাদন কম হয় বলে বিদুৎ না দিয়েও ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছে ঠিকই। সুত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ৪ জুলাই ২০২২, দৈনিক সমকাল ১৫ অক্টোবর ২০১৯
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে এমনটা হয়েছে।

Leave a Comment