রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই

বাংলাদেশের বর্তমান সিইসি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের মানুষ ভেবেছিল তিনিও মনে হয় হুদা কমিশনের পথ-ই অনুসরণ করবেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর সিইসির কথাবার্তায় কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে দেশের সচেতন জনগণের মনে। সিইসির কথাবার্তায় ভোট সুষ্ঠ হতে পারে এমন সংকেতে পাওয়া যাচ্ছে।

শুধু শুধু মুখের কথায় কিন্তু চিড়া ভিজে না। আর চুন খেয়ে মুখে ঘাঁ হলে যেমনি দই দেখলেও ভয় লাগে, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ঠিক তেমনি ভয় হয়তো পাচ্ছে কেউ কেউ। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সিইসি সেই ভয় কতটুকু দুর করতে পারে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দেশের সচেতন জনগণ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। ছবি: সংগৃহীত

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা দিতে সুন্দর এবং যুগোপযোগী প্রস্তাবনা দিয়েছে বর্তমান সিইসি। প্রস্তাবনা অনুসারে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোন সাংবাদিককে যদি বাধা দেওয়া হয়, তাহলে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান চাওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার আগে কিংবা পরে এমন গঠনমূলক প্রস্তাবণা আর কোন সিইসি দিয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই। আমি একজন সরল বিশ্বাসী মানুষ বিশ্বাস করি যে, চেষ্টা করলে বর্তমান সিইসি সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে। যা সিইসির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)
এ টি এম শামসুল হুদা। ছবিঃ সংগৃহীত

একটি জেলায় সারা বছর যেখানে সর্বোচ্চ ১২/১৩ জন সাংবাদিক সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। আর বাকি ২০/২৫ জন সাংবাদিক সক্রিয় সাংবাদিকদের সাহায্য-সহযোগীতা নিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন, সেখানে নির্বাচনের আগে নির্বাচন অফিসে পর্যবেক্ষক কার্ডের জন্য এত সাংবাদিক আসে কোথায় থেকে? এই অনিয়মিত সাংবাদিকরা আসলে নির্বাচনের আগে কোথায় সাংবাদিকতা করে?

২০০৮ সাল থেকেই দেখে আসছি, সাংবাদিক কার্ড নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র দখলে নিয়ে রাখছে। এসব দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় থেকে সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড পাইয়ে দেয় কে? কিছু নিম্নমানের দৈনিকের চাষাপোষা মালিক ও সম্পাদক পক্ষ দলীয় নেতাকর্মীদের সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড পাইয়ে দেয়।

সাংবাদিক কার্ড ও পর্যবেক্ষক কার্ড নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা কি করে? পর্যবেক্ষক কার্ড নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা বাসায় ফেলে রাখে না। তারা সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড নিয়ে কেন্দ্র দখলে নেমে যায়। সর্বশেষ নির্বাচনে বাকেরগঞ্জ, বরিশাল সদর উপজেলা, বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা, বানারীপাড়াসহ আরও বিভিন্ন স্থানে একই চিত্র দেখেছে দেশবাসী।

দলীয় নেতাকর্মীরা সাংবাদিক আইডি কার্ড আর নির্বাচন অফিসের পর্যবেক্ষক কার্ড গলায় ঝুলিয়ে এক বুথ থেকে আরেক বুথে ঘুরে বেড়ায়। বুথের চারপাশে বিরুধী ভোটার তাড়ানোর বলয় সৃষ্টি করে তারা।

বাকেরগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরামদ্দিতে সাংবাদিকরা লাইভ করতে গেলে, সাংবাদিকদের আটকে দেয় সাংবাদিক কার্ডধারী কয়েকজন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তারা সাংবাদিকদের জানান যে, তারা দলীয় নেতাকর্মী। কেন্দ্র কেবল দখলে নিয়েছেন। সাংবাদিক নামধারী নেতাকর্মীরা লাইভ অন্য কেন্দ্রে দিতে অনুরোধ করে সাংবাদিকদের এবং এক পর্যায়ে বল প্রয়োগ করে আসল সাংবাদিকদের বের করে দেয় তারা। এই একটি উদাহরণ নয় আরো অনেক আছে দেশে।

নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রচেষ্টাটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি ধন্যবাদ জানাই সিইসিকে। কিন্তু অন্যদিক থেকে বেশ শঙ্কিতও বটে। শঙ্কার কারণটি নির্বাচন কমিশনের সাথে সংযুক্ত নয়। কিন্তু তারপরও ক্ষেত্রফল নির্বাচনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত আইনে মৌসুমী সাংবাদিকরা (যারা ভোটের আগে কার্ড নেন) এই আইন প্রয়োগ করে ফায়দা লুটবে। কিন্তু পেশাদারী সাংবাদিকরা তা পারবেন না। তার কারণটাও ব্যাখ্যা করব, ইনশাআল্লাহ।

মৌসুমী সাংবাদিকদের ভিড়ে পেশাদারী আসল সাংবাদিকরা হারিয়ে যাবে ভোট কেন্দ্রে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত আইনে মৌসুমী সাংবাদিকরা (দলীয় নেতাকর্মীরা) বিরোধী পক্ষ ভোট দিতে এলে তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতায় বাধা দানের অভিযোগ এনে তিন বছরের সাজা প্রদানের দাবী প্রশাসনের কাছে করবে বা করতেই পারে।

সাংবাদিকদের সুবিধা দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন যে আইনের জন্য প্রস্তাব করেছে, তৃতীয় কোন পক্ষ সেই আইনের সুবিধা লুফে নিবে কিনা সেটি আগে চিন্তাভাবনা করতে হবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতিতে শেষ বলতে কোন শব্দ নাই।

Leave a Comment