সমাবেশ করতে দিলে ক্ষতি কি?

যেকোনও রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের দেশে যে বা যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তারা একমাত্র নিজের দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে কখনও সভা-সমাবেশ করতে দেয়না। কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দেয়না।

আমাদের দেশে একসময় মনে করা হতো, ‘যতো মত, তত পথ`। কিন্তু বর্তমানে একটি রাজনৈতিক দল, ‘যত মত, তত পথে’র দেশেকে একদলীয় বাকশালের দেশে পরিণত করতে চাচ্ছে। দেশে ‘ভিন্নমতপোষণ’কে মনে করা হচ্ছে স্পর্ধা। আর এই স্পর্ধাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে আমাদের দেশে।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করতে চাইছে। কিন্তু দেশের ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এসব সভা-সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে সব রকম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বছরখানেক আগে তো বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতিই দেওয়া হতো না। যদিওবা দেওয়া হতো, সেসব সমাবেশ ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক বাধার মুখে পড়তে হতো বিএনপিকে। যাইহোক, বর্তমানে একদিকে যেমন বিরোধী এই রাজনৈতিক দলটিকে সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে, একইসঙ্গে সমাবেশে যাতে লোকজন না আসতে পারে সেজন্য যানবাহন বন্ধ করে সমাবেশে যোগদানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বিএনপিকে প্রশাসন থেকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলেও যানবাহন বন্ধ করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রংপুরের সমাবেশকে ঘিরে ঘোষিত ও অঘোষিত এই পরিবহন ধর্মঘট দেখা গিয়েছে।

আগামীকাল ৫ নভেম্বর বিএনপির বরিশালের বিভাগীয় সমাবেশকে বানচাল করার জন্য সেই একই কায়দায় পরিবহন ধর্মঘট দেওয়া হয়েছে। কোথাও ঘোষণা দিয়ে, কোথাও বা অঘোষিত এসব পরিবহন ধর্মঘটে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ার খরব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট জন ভোগান্তি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের কোনও মাথা ব্যথা নেই।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবিঃ সংগৃহীত

পরিবহন খাতের নেতারা বারবার বলছেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় নাকি তারা যান চলাচল বন্ধ রাখছেন। গাড়ি ভাঙচুর হলে কি বিএনপি ক্ষতিপূরণ দিবে, এমন প্রশ্নও পরিবহন খাতের নেতারা করছেন। যদিও ‘নিরাপত্তা’র বিষয়টি দেশের জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

বিএনপির ডাকা সমাবেশের সময় গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলেও কিন্তু হরতাল ডাকলে গণপরিবহন চালানোর ঘোষণা দেন পরিবহন খাতের নেতারা। বড় জানতে ইচ্ছে করে, হরতালে সময় গাড়ি ভাঙচুরের ঝুঁকি বেশি থাকে নাকি সভা-সমাবেশ করার সময় গাড়ি ভাংচুরের ঝুকি বেশি থাকে?

হরতালের সময় গাড়ি ভাঙচুরের ঝুঁকি বেশি থাকে। হরতালের সময় যদি গাড়ি চালানো হয়, তাহলে সভা-সমাবেশের আগে কেন গাড়ি বন্ধ রাখা হয়? উপরোক্ত আলোচনায় বোঝাই যায় যে, নিরাপত্তার ইস্যুটি অজুহাত দেখিয়ে বিরোধী সভাসমাবেশ বানচাল করাই হল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

আসলে গণপরিবহন চালু বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি সম্পুর্ণ রাজনৈতিক। কারণ বাংলাদেশের পরিবহন মালিকদের সংগঠনগুলোর নেতারা সবসময়ই সরকার নিয়ন্ত্রিত লোকদের হাতে থাকে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে নেতৃত্বও সেই দলের নেতাদের হাতেই থাকে। তারা সব সময়ই চায় বিরোধী দলকে বিপদে ফেলতে, তাদের কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে।

আমাদের দেশে বিরোধী রাজনীতিতে সুস্থ গণতান্ত্রিক বা নিয়মতান্ত্রিক ধারায় আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হয় না। বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, ক্ষমতাসীনদের বেকায়দায় ফেলার জন্য, বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও নাশকতার আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই তো সরকারকে বিরোধীদলের ব্যাপারে সব সময়ই চোখকান খোলা রাখতে হয়।

কিন্তু বিরোধী দলগুলোর কেউ ষড়যন্ত্র বা নাশকতা করলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল ও আইনের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। তা না করে কেবলমাত্র মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে দমন-পীড়ন নির্যাতন রাজনীতিকে কলুষিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে বিদ্বেষ ও ঘৃণার।

আমাদের দেশে বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি জারি রয়েছে। বিএনপি বারবার অভিযোগ করছে যে, ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোরে তাদের দমন-পীড়ন করতে পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা এসব অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করে বলছে, পুলিশ, প্রশাসন ও আইন-আদালত সব কিছুই যার যার মতো করেই চলছে।

প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীনরা মুখে যাই বলুক, আসলে বর্তমানে দেশে কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো চলছে না। ক্ষমতাসীন দলের কারও কারও আচরণ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সমালোচনা বা ভিন্নমত দেখলেই তেড়েফুড়ে উঠছেন কেউ কেউ। এই বেপরোয়া নেতারা ভুলেই গিয়েছেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, যে-কেউ যে-কারও গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে।

আমাদের দেশে ছোটকাল থেকেই ‘শুধু আমার, আর কারও নয়’ এই একটিমাত্র ভাবনাকে প্রায় স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়েছে প্রতিটি শিশুর অন্তরে। হয় তুমি আমার পিছনে, নয়তো আমার মুখোমুখি এই নীতিই যেন প্রায় প্রতিটি মানুষের প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে।

যারফলে যেকোনো ভিন্ন মতকেই মনে করা হচ্ছে বিরোধিতা। আর যেকোনো বিরোধিতাকেই ধ্বংসযোগ্য মনে করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃতির নিয়ম তো এমন হওয়ার কথা নয়। বৈচিত্র্যই প্রকৃতির মূল শক্তি। অসংখ্য বৈচিত্র্যের বিপুল সহাবস্থানের কারণেই নানা প্রতিকূল অবস্থায়ও প্রকৃতি টিকে থাকতে পারে। মানুষ প্রকৃতিরই এক সংস্থান, প্রাকৃতিক নিয়মের বিরোধী কোনো অবস্থানেই সে রক্ষা পাবে বলে মনে হয়না।

ভিন্ন মত পোষণকারীদের রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে, চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা এর আগেও এই পৃথিবীতে অনেক বার সংগঠিত হয়েছে। ইতিহাস স্বাক্ষী, একমাত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী রাষ্ট্রীয় শাসকরা ভিন্ন মত পোষণকারীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা, ভিন্ন মত পোষণকারীদেরকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা বহু বার করেছে। একমাত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী সবাই কিন্তু হিটলার কিংবা আইয়ুব খান নয়।

গত কয়েক বছরে কেবল রাষ্ট্রীয় শাসকেরা এই অসহিষ্ণুতা, এই অধৈর্যকে বিকেন্দ্রায়িত করে দিয়েছেন দেশজুড়ে। সমাজের নানা স্তরে অসহিষ্ণুতার ক্রোধ ও হিংসা এখন ফসলখেতের মতো বিস্তার লাভ করেছে।

একমাত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসীরা যদি কল্যাণ এবং সঠিক পথে থাকে, তাহলে ভিন্ন মত পোষণকারীদেরকে কেন রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে শায়েস্তা করতে হবে?

Leave a Comment