সীমান্তে উত্তপ্ত বিএসএফ নিশ্চুপ বিডিআর

২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ মোট ১৪৬ জন বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। ২৫ এপ্রিল ২০১৭ ইং তারিখে দশম সংসদের দশম অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের উত্তরে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় সংসদকে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বিগত ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে বিজিবি’র হাতে আটক যথাক্রমে ২০৯, ১৭৪ ও ৪০ জন ভারতীয় নাগরিককে বিএসএফ এর হাতে হস্তান্তর করার কথা উল্লেখ করেছিলেন। (সূত্র: বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার, তারিখ: ২৫/০৪/১৭)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তথ্য হল সরকারি পরিসংখ্যান। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অর্থাৎ বিএসএফের গুলিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যানটা আরো বেশি।

ভারত এই অঞ্চলের একটি বড় দেশ। ভারতের সাথে বাংলাদেশ ছাড়াও সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমার, চীন, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার। এরমধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্থান ছাড়া অন্য প্রতিটি দেশের সাথেই ভারতের সীমান্ত উন্মুক্ত। বরং বাংলাদেশ সীমান্তের চতুর্দিকেই কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। কাজেই বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে কম হওয়ার কথা। কিন্তু সীমান্তে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায় তার উল্টো।

বাংলাদেশ সীমান্তে টহল দিচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ


বিএসএফ শুধু বাংলাদেশি নাগরিকদেরকেই পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। বিএসএফের অস্ত্রের টার্গেটেই হল বাংলাদেশি নাগরিক। অন্য কোন দেশের নাগরিককে তারা এভাবে হত্যা করতে পারে না। পাকিস্থান হল ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও চিরশত্রু দেশ বা রাষ্ট্র। সুতরাং পাকিস্থান সীমান্তে বিএসএফের হাতে সর্বাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটার কথা। তাই পাকিস্থানের সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

ভারত-পাকিস্থান সীমান্ত হত্যার তথ্য পাওয়া যায় উইকিপিডিয়ায়। ইউকিপিডিয়া নিয়মিত পাকিস্থান-ভারত সীমান্তে মৃত্যুর তথ্য হালনাগাদ করে থাকে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে ১৫ জন পাকিস্থানি নাগরিক নিহত হয়েছে। ২০১৪ সালে ৯ জন নিহত হয়েছে এবং ২০১৫ সালে ২২ জন পাকিস্থানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। ভারত-পাকিস্থান সীমান্তে পাকিস্থানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতেও প্রায় সমপরিমাণ ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছে।

এই তিন বছরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১৪৬। একই সময়ে পাকিস্থান-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে শুধুমাত্র ৪৬ জন পাকিস্থানি নাগরিক নিহত হয়েছে। নিহত পাকিস্থানি ৪৬ জন নাগরিকদের মধ্যে অধিকাংশই সামরিক এবং আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য। আর বাংলাদেশের নিহত নাগরিকরা সবাই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

সীমান্তে কাঁটাতারে বেড়ায় ঝুলছে ফেলানীর মৃতদেহ

পাকিস্থান ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শত্রু রাষ্ট্র। বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্থানের সাথে তাদের সীমান্ত অনেক বেশি। অথচ সীমান্তে পাকিস্থানি নাগরিকদের চেয়ে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিহত হওয়ার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেশি। সম্প্রতি একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টেরর তথ্য মতে, ২০১৪ সালে যেখানে বিএসএফের হাতে ৩৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। সেখানে ভারত-পাকিস্থান সীমান্তে বিএসএফের হাতে ৯ জন পাকিস্তানী নাগরিক নিহত হয়েছে।

সীমান্তের পরিসংখ্যান বলছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হাতে যত হত্যাকাণ্ড হয়, ভারত-পাকিস্থান সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তার চেয়ে প্রায় তিনগুণ কম। ‘বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র। আর পাকিস্তান ভারতের শত্রু রাষ্ট্র। কিন্তু সীমান্ত হত্যার পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ ভারতের শত্রু রাষ্ট্র। বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের কি এভাবে হত্যা করা যায়? আর বাংলাদেশি যেসব নাগরিককে হত্যা করা হয় তারা সবাই নিরস্ত্র ও সাধারণ মানুষ। তাদের গুলি করাই তো অন্যায়।

এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো- বাংলাদেশে ভারতীয় নাগরিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটলে তাদের হস্তান্তর করা হয়েছে বিএসএফের কাছে। অন্যদিকে বন্ধু রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশিদের দেখামাত্র গুলি করে হত্যা করছে। এটা কি ধরণের বন্ধত্ব? এটাই কি বন্ধুরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট?

আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসিনা এসব হত্যা বন্ধ করতে পারছেন না। উল্টো তিনি বাংলাদেশের নদী, বাংলাদেশের বন্দর, বাংলাদেশের সড়ক আর বাংলাদেশের রেলপথ খুলে দিয়েছেন ভারতের জন্য? কিন্তু কেন?

মা-বাবার প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তান মারা যাওয়ার পর জন্ম নেয়া তৃতীয় সন্তানটি যাতে বেঁচে থাকে, এই আশা নিয়েই তার নাম রাখা হয়েছিল ফেলানি। বধূ বেশে স্বামীর ঘরে যাওয়ার মতো করে মেয়েকে নিজ হাতে সাজিয়ে দিয়েছিলেন তার মা জাহানারা বেগম। চারচালা টিনের ভাঙা ঘরে বসে একমাত্র মেয়ের সেই স্মৃতিটুকু স্মরণ করে কাদছিলেন মা জাহানারা বেগম। বলছিলেন, সঞ্চয় যা ছিল সব দিয়ে সোনা রূপার গয়নাও কিনে দিয়েছিলেন ওকে। কিন্তু তার মেয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে নিজের ঘরে। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী ভোর বেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তের দক্ষিণ অনন্তপুর হাজিটারী গ্রামের ৯৪৭/৩ এস আন্তর্জাতিক পিলারের কাছে ভারতীয় অভ্যন্তরের খেতাবেরকুটি এলাকায় বিএসএফ নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে ১৪ বছরের কিশোরি ফেলানিকে।

কাটাতারের বেড়ায় ফেলানীর মৃতদেহ নয়, ঝুলছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র

‘ফেলানি কে? বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এক কিশোরীর নাম ফেলানি। যে কিশোরী লাশ হয়ে ঝুলেছিল কাঁটাতারের বেড়ায়। ১৪ বছরের ফেলানী বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল পরদিন। কিন্তু বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হলো না তার। বিয়ের দিন লাশ হয়ে ঝুলে থাকল সীমান্তের কাটাতারের বেড়ায়।

৭ জানুয়ারী ২০১১ সালে কাটাতারের বেড়ায় ফেলানিরর লাশ ঝুলেনি। কাটাতারের বেড়ায় ঝুলেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রক্তাক্ত মানচিত্র। কাটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ফেলানী পানি পানি বলে চিৎকার করেছিল। কিন্তু কেন পানি পানি বলে চিৎকার করল সে? ফেলানি কি জানত না, ভারতের কাছ থেকে আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারিনি? কেন পারিনি, আমরা দুর্বল রাষ্ট্র বলে! কেন পারিনি, আমাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে! কেন পারিনি, আমাদের দেশের শাসন বিভাগ দিল্লির তোষামোদে ব্যস্ত বলে! সেটাকি ফেলানি জানত না?

২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি সীমান্তের কাটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা লাল পাজামা পরা ফেলানির লাশের ছবি দৈনিক নয়া দিগন্তে যারা দেখেছেন, তাদের হৃদয় কতটুকু হাহাকার করে উঠেছিল, সে কথা আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমার চোখে পানি তখন আটকাতে পারিনি। আমি কেঁদেছি, আমি অনেক কেদেছি ফেলানির জন্য।

কাটাতারের বেড়া থেকে ফেলানীর মৃতদেহ নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ

ফেলানি কোনো লাশের নাম নয়। ফেলানি হল এক টুকরো বাংলাদেশ। ফেলানি হল বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা। ফেলানি হল একখন্ড সবুজ ভূমি। ফেলানি হল রক্তাক্ত জাতির পতাকা। ফেলানি হল ছোট একটি দেশ, নাম বাংলাদেশ।

বিএসএফের এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনার কোনো প্রতিবাদ করতে আমি শুনিনি। ফেলানির জীবন কিছুতেই ফিরে পাওয়া যাবে না জানি। কিন্তু প্রতিবাদটুকু করলে আমরা সামান্য হলেও সান্ত্বনা পেতাম।’
ফেলানির লাশ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাঙালির অসহায়ত্বের কথা। ফেলানির ঝুলন্ত লাশ এবং মর্মস্পর্শী মৃত্যু বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীকে (বন্ধুত্বকে) ধিক্কার দিয়ে বলে গেল কাঁটাতারে সীমান্তের ভয়াবহতার কথা। ফেলানি দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ধিক্কার দিয়েছে, দেশকে নয়। এজন্যই মাটির টানে ছুটে আসছিল ১৪ বছরের কিশোরী ফেলানি বউ সাজার স্বপ্ন নিয়ে। দেশে ফেরার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল সে। তার সেই স্বপ্নের কবর রচনা করেছে বন্ধুদেশের শত্রু বিএসএফ।

বিরামহীনভাবে বন্ধুদেশের শত্রুরমত আচরণ বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলেছে। ভারতীয় আগ্রাসনের হিংস্র থাবায় বিপন্ন মানবতা, বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। সীমান্তে পাখির মত গুলি করে বাঙ্গালী হত্যা করছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। ফেলানিদের লাশ কাঁটা তারের বেড়ায় ঝুলে রাখা হচ্ছে। ভারতীয়দের আচরণ ইসরাইলের ইহুদিদের মত!

দিল্লীকে তোষামোদকারী তৎকালীন সরকার আমলে বাংলাদেশের জন্যে সীমান্ত সমস্যা অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছিল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের বিএসএফের অবৈধ আচরণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সীমান্ত আইন ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের উভয়দিকে ১৫০ গজ করে যে স্থান রয়েছে, তাকে বলা হয় ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’। সে স্থানে সীমান্তের কোনো দিকেই কোনো স্থাপনা বা পরিখা খনন করা যাবে না। কিন্তু ওই নো ম্যান্স ল্যান্ডে ভারত কাঁটাতারের বেড়া ও সড়ক নির্মাণ করেছে। নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করেছে। বিএসএফের ক্যাম্প নির্মাণ করেছে। এসব অবৈধ কাজে বিএসএফকে ভারতীয় সেনাবাহিনী সাহায্য দিয়ে আসছে। যারফলে সীমান্তে যুদ্ধ আবশ্যক হয়ে যাচ্ছে।

উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি, সিলেটের পাদুয়া ও কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ির কথা! বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষ দিকে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সিলেটের সীমান্তে পাদুয়া দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বিডিআরের বীর জওয়ানরা নিজেদের জীবনের ঝুকি নিয়ে ১৫ এপ্রিল পাদুয়াকে দলখমুক্ত করেছিল। এরপর ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্গন করে কুড়িগ্রাম জেলার বড়াইবাড়ি গ্রামে ঢুকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিএসএফ-এর একটি কোম্পানী বড়াইবাড়ি গ্রামটি দখল করে নিয়েছিল।

ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফ যখন দেখল যে, বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্প থেকে কোনো সাড়া নেই, তখন ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফ মনে করেছিল বিডিআরের জওয়ানরা তাদের ভয়ে প্রাণ বাচিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এই ভেবে ভারতীয় সেনা ও বিএসএফ বাংলাদেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। বিডিআর ক্যাম্প থেকে মেশিনগানের রেঞ্জের ভেতরে আসার পরপরই বিডিআরের জওয়ানরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেদের জীবনের ঝুকি নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফের ওপর বিডিআর ক্যাম্পে অবস্থিত প্লাটুনটি গুলি ছোড়তে থাকে। বিডিআর জওয়ানদের অতর্কিত হামলায় ঘটনাস্থলে নিহত হয় ১৭ জন ভারতীয় সেনা এবং আহত হয় অনেক বিএসএফ সদস্য। নিহতদের লাশ ফেলে, আহতদের নিয়ে ভারতীয় সেনা ও বিএসএফ কোনোক্রমে প্রাণ বাচিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

[মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সাবেক মহাপরিচালক। স্বাধীন বাংলাদেশে তার সমান বীরত্ব আর কেউ দেখাতে পারেননি। প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারকে যুদ্ধ করে হারিয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন তিনি।

এই দু’টি ঘটনা নিয়ে ভারতীয় পার্লামেন্টে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিজেপি’র এক উন্মাদ সদস্য পার্লামেন্ট ভবনে চিৎকার করে ঢাকায় অবস্থিত বিডিআর হেড কোয়ার্টার্স বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার দাবি করেছিল।

অপরদিকে, দিল্লি থেকে বিডিআরের বিজয়ী বীরদের এবং তৎকালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল আ.ল.ম. ফজলুর রহমানকে কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্য বাংলাদেশের তৎকালীন শাসন বিভাগের ওপর জোর চাপ দিয়েছিল।

দেশের জনমত এবং পত্র-পত্রিকার মতামত উপেক্ষা করে ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিল তৎকালীন শাসন বিভাগ। তারা দিল্লিকে খুশি করার জন্য সিলেটের পাদুয়াকে আবারো ভারতের দখলে দিয়ে দিয়েছিল এবং বিডিআর প্রধানকে তার পদ থেকে অপসারণ করেছিল। বিডিআরের দেশপ্রেম, সাহস ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব তৎকালীন বাংলাদেশের শাসন বিভাগের কাছে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়েছিল।

বেপরোয়া বিএসএফের গুলি করে বাংলাদেশি হত্যার জবাব কি হতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুরের নারায়ণতলা, দোয়ারাবাজারের বাশতলা, তাহিরপুরের বারেকটিলা ও টেকেরঘাটের সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা হয়েছে আমার। যার উপর ভিত্তি করে আমি এই লেখাটি তৈরী করেছি।

সরকারের কাছে সীমান্তবর্তী জনগণের প্রশ্ন হল: বিএসএফ বাংলাদেশীদের নো ম্যান্স ল্যান্ডের ধারে কাছে দেখা মাত্রই গুলি চালায়। কিন্তু বিজিবি কেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ভারতীয়দের গুলি না করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে? বিএসএফ নো ম্যান্স ল্যান্ডের ধারে কাছে দেখা মাত্রই গুলি করে। কিন্তু ভারতীয়রা যখন অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে, তখন বিজিবির অস্ত্র নীরব থাকে কেন?

সীমান্তবর্তী এলাকার জনগণ বলছে, বাংলাদেশ শাসন বিভাগের দায়িত্ব হল: তার দেশের প্রত্যেকটা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। ভারতীয় বিএসএফ অহরহ সীমান্তবর্তী বাংলাদেশিদের পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের শাসন বিভাগ এর কোন জবাব দিচ্ছেনা কেন? শাসন বিভাগ কেন ভারতের তোষামোদে ব্যস্ত? সীমান্তবর্তী জনগণ জানতে চায়, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নাকি ভারতের অঙ্গরাজ্য?

সীমান্তবর্তী জনগণের দাবি: বিজিবির প্রধানকে শাসন বিভাগ বা রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিবেনা। বিজিবির প্রধানকে নিয়োগ দেয়া হবে নির্বাচনের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী জনগণের ভোটে। বিজিবি প্রধানকে তার কাজের জন্য শাসন বিভাগ নয় বরং সীমান্তবর্তী জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে। সীমান্তবর্তী জনগনের বিশ্বাস: অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিলেই ভারতের বিএসএফ ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক যেমনটা পাকিস্থানের সাথে হয়।

সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম. ফজলুর রহমান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ভারতীয় বিএসএফের প্রতিটা আঘাতের উপযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম. ফজলুর রহমান মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেজন্য তিনি সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আমরা বাঙ্গালী। আমরা বাংলাদেশী। আমরা শান্তিপ্রিয়। ত্রিশ লক্ষ বাঙ্গালীর তাজা রক্তে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কিনেছি। বিএসএফ কিংবা ভারতীয়দের অন্যায়ের কাছে মাথানত করার জন্য নয়।

রুখে দাড়াও বাঙ্গালী। শুধুমাত্র ভারত নয়, আমেরিকাও তোমাদের সালাম জানাবে!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমার এই লেখাটি ১৮ মার্চ ২০১৯ সালে ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশ করা হয়েছিল।

7 thoughts on “সীমান্তে উত্তপ্ত বিএসএফ নিশ্চুপ বিডিআর”

  1. এসব ছবি দেখলে আমি আর স্থির থাকতে পারি না

    Reply
  2. বিএসএফ কঠোর না হলে বাঙ্গালিরা লাই পেয়ে যাবে। আর বাঙ্গালিরা লাই পেলে মাথায় চড়ে বসে

    Reply
  3. বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় একটি ছোট দেশ। তাই বাংলাদেশের সাথে ভারতের এমনটি করা ঠিক নয়

    Reply

Leave a Reply to সাহিত্য চর্চা Cancel reply