স্বাধীন দেশে ভিন্নমত পোষণ করা ক্রমেই বিপদজনক হয়ে উঠেছে

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার

ঘটনায় আতঙ্কিত গোটা দেশ, চমকে উঠেছে জাতির বিবেক। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। যে বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোতে শিক্ষার্থীরা যায় উচ্চশিক্ষার জন্য, সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে।


প্রসঙ্গত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি নিয়ে গত ৫ অক্টোবর শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার ফাহাদ। এর জের ধরে ৬ অক্টোবর রবিবার রাতে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে তার লাশ সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন আবরার ফাহাদ?? যার কারণে তাকে হত্যা করা হয়!

ফেসবুকে প্রকাশ করা আবরার ফাহাদের একটি সেলফি। ছবিটি বিবিসি বাংলা অনলাইন পত্রিকা থেকে নেওয়া


আবরার ফাহাদের সেই স্ট্যাটাস;
‘‘১। ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।


২। কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউসেক মিটার পানি দেব।’


৩। ভারতকে গ্যাস দেয়ার সমালোচনা করে বুয়েটের এই শিক্ষার্থী লেখেন, ‘কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’’


গত ৬ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল। যার হেডলাইন ছিল “সরকারের সমালোচনা করতে বাধা নেই: বিবিসিকে শেখ হাসিনা”
লন্ডনে বিবিসির মানসী বড়ুয়াকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা অতীতের আর যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভালো। এবং সরকারের সমালোচনা করতে কাউকে বাধা দেয়া হয় না।


আমি বিবিসি বাংলার সেই সংবাদটি ভালোভাবেই পড়েছিলাম। এখন আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানতে চাই, আপনার সরকার তো কাউকে মত প্রকাশে বাধা দেয়না। যে কেউ তো আপনার সরকারের সমালোচনা করতে পারে। আবরার ফাহাদ তো তার মত প্রকাশ করেছে। সেটা আপনার সরকারের পক্ষেই হোক কিংবা বিপক্ষেই হোক। আপনার ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠা ছাত্রলীগ তাকে হত্যা করল কেন?

আবরার ফাহাদের নিতর দেহ। ছবিটি অনলাইন পত্রিকা থেকে নেওয়া


মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে ভিন্নমত বা সমালোচনা গণতন্ত্র ও সভ্য সমাজের অপরিহার্য অংশ। আমরা যদি নিজেদের সভ্য বলে পরিচয় দিতে চাই, তাহলে অন্যের কথা শুনতে হবে। অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাভাবিক মতপ্রকাশের কারণে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের বিধান হতে পারেনা। ধর্মের নামে জঙ্গিগোষ্ঠীর লোকজন একসময় দেশে ভিন্নমত প্রকাশকারীদের একের পর এক হত্যা করা শুরু করেছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যদি সেই একই কারণে সহপাঠীদের হত্যা করে, তাহলে জঙ্গিগোষ্টী ও ছাত্রলীগের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
আবরার ফাহাদ হত্যার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে নয়, একজন মা হয়ে আবরার হত্যার বিচার করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব শীঘ্রই গণভবনে আবরার ফাহাদের মা-বাবা ও ভাইয়ের সাক্ষাত চাইবেন। আবরার ফাহাদের মাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি মুছে দিবেন। আবরার ফাহাদের ভাইকে যেকোনো ব্যাংক বা অন্য কোথাও চাকরি দিবেন। যেমনটা হয়েছিল নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকান্ডে। কারণ প্রধানমন্ত্রী জানেন, যাঁরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাঁরা মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেনি; তারা সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায়ই এই দানব তৈরি হয়েছে। আর এই দানবদের ব্যবহার করেই সরকার বারবার ক্ষমতায় ঠিকে আছে।
রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলো কোনো ফৌজদারি অপরাধ করলে প্রথমে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আর যদি তা ধামাচাপা না দেওয়া যায় তাহলে দল থেকে বহিষ্কার করার একটা নাটক করতে দেখা যায়। আমার মনে হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবেনা। অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর দলের কার্যত কোনো ধরনের নজরদারি নেই। যারফলে তাদের অনেকটা যা খুশি তাই করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ‘অপরাধী যেই দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না’ এই বাক্য উচ্চারণ করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করবেন না। প্রধানমন্ত্রী হয়ে নয়, একজন মা হয়ে বিচার করব, এই ধরণের কথা বলবেন না। কারণ আপনি সরকার প্রধান কিন্তু বিচারক নন। কোনো অপরাধের বিচার করা বিচার বিভাগের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী হয়ে নয়, একজন মা হয়ে আবরার হত্যার বিচার করব। আপনার এই কথায় প্রমাণিত হয় যে, বিচার বিভাগ শাসন বিভাগ থেকে স্বাধীন নয়।
হত্যাকারীদের বিচার হোক, হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক, এটা সবার মতো আমারও দাবি। তবে যে আতঙ্কিত রাজনীতি সারা দেশে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে, তার অবসান হওয়া খুবই জরুরী। ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসীদের এই ঘৃণ্য তৎপরতা বন্ধ করা হোক। এই প্রত্যাশাই রইল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি ২৫ অক্টোবর ২০১৯ সালে লেখা। আমার এই লেখাটি বিডিনিউজ ব্লগ সাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল 

10 thoughts on “স্বাধীন দেশে ভিন্নমত পোষণ করা ক্রমেই বিপদজনক হয়ে উঠেছে”

  1. আওয়ামীলীগ সরকার দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে

    Reply
  2. There is only one difference between good and bad people. Good people think everyone is as good as he is. And bad people think everyone is as bad as him. If you are a thief, all the people in the world think you are a thief.

    Reply
  3. আওয়ামীলীগ সরকার বাংলাদেশকে শ্রীলংকার মতো দেওলিয়া করে দিচ্ছে

    Reply

Leave a Comment