হঠাৎ দেশের কি এমন হলো?

আমরা নাকি বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল? ইতিপূর্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কত কথা-ই না শুনেছি। সামনের দিনে হয় আরেক সিঙ্গাপুর, আর না হয় মালয়েশিয়ার মতো হতে চলেছিলাম আমরা। দেশের জিডিপি বেড়ে ছিল, মাথাপিছু আয়ও নাকি বেড়ে গিয়ে ছিল, বেড়ে গিয়েছিল আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ। পদ্মা সেতুও হয়ে ছিল সম্পূর্ণ নিজেদের টাকায়। এদিকে মেট্রো রেল হচ্ছে, চিটাগাঙ্গে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে নাকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল হচ্ছে, ব্রিজ – কালভার্ট থেকে শুরু করে কতই না উন্নয়ন হচ্ছিল। এসব খবর অহরহ শুনতে শুনতে কান জালা পালা হয়ে গিয়েছিল। সবকিছুর পরেও মনে হয়েছিল, ভালোই তো চলছে দেশটা। কিন্তু হঠাৎ দেশের কি এমন হল? ভয়াবহ লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, রিজার্ভ সংকট এসব সমস্যাগুলো হুট করে কোথা থেকে এল?

প্রকৃতপক্ষে ভালো চলছিলো না সবকিছু। বছরের পর বছর ধরে ভায়াবহ দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক খাতে লুটপাট, শেয়ার বাজার আর ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার আর তার সাথে জড়িত নানা ক্ষমতাশালীদের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা কথা ভুলে যাবার নয়। এতো এতো দুর্নীতি আর লুটপাট হয়েছে দেশে, যার একটা বড় প্রভাব পরেছে সরকারের ওপর। যেমন সরকারের আয় কমে গেছে। রিজার্ভ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু উচ্চভিলাষী বাজেট এর ঘাটতি পূরণ তো করতে হবে। ডলারের দাম বেড়েছে। রপ্তানি আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয় আরও বেশী বেড়ে গেছে। এখন সরকারের হাতে এতো টাকা নেই যে উচ্চভিলাষী বাজেট এর ভার পূরণ করতে পারবে।

এমতাবস্থায় ঋণ দরকার। ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশী। সরকার আশা করছে বিদেশী উৎস থেকে ৯৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। বাকি রয়ে যাচ্ছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা যার মধ্যে দেশের মধ্যে বিদ্যমান ব্যাংকগুলো থেকে নেয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। তাহলে বাকি টাকা আসবে কোথা থেকে? হ্যাঁ, আর এই বাকি টাকাগুলোই নেয়া হবে দেশের এই জ্বালানি তেলের দামের বর্ধিতাংশ থেকে। এজন্যই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।

সরকার এখন আই এম এফ এর ঋণ নিতে তাদের দ্বারস্থ হয়েছে। কারণ, তাকে তো সঙ্কট সামাল দিতে হবে। এখন আই এম এফ তো আর এতো সহজে ঋণ দেবে না। তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু নীতি আছে। তাদের মধ্যে একটা হচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি আর কৃষি খাতে সরকারী ভর্তুকি বাদ দিতে হবে।

অন্যদিকে আবার শুরু হয়েছে পুরনো সেই উপদ্রব। বিদ্যুতের ঘাটতির জন্য জনজীবন অতিষ্ঠ। চাহিদা অনুযায়ী এখন আর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না সরকার। সুতরাং লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন পুরোটাই হয়ে গেছে একদলীয়। কোনও কার্যকর গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। কোনও শক্তিশালী বিরোধী দল নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক ভারসাম্য যে বজায় থাকবে তার জন্য কোনও জবাবদিহিতাও নেই। যদি জবাবদিহিতা থাকতো তাহলে সরকারকে তার যা খুশি তাই করার আগে একশোবার ভাবতো হতো। কারণ তার তখন একটা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার একটা ভয় থাকতো। এখন যে অবস্থা তাতে কোনও সরকার তার খেয়াল খুশি মতো এরকম কোনও পদক্ষেপ নিতে বা বাস্তবায়ন করতে দ্বিতীয়বার ভাবার কথা নয়। কারণ পাল্টা প্রতিক্রিয়ার তার ন্যুনতম কোনও ভয় নেই।

অন্যদিকে যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে করে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের বৈদেশিক ঋণ শোধ করা পুরোদমে শুরু হবে ২০২৪ সাল থেকে। তখন আসবে আরও বড় চাপ। এখনই দেশের অর্থনীতির এই ভয়াবহ অবস্থা। তখন সামনের দিনের ঐ ধাক্কায় তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের অর্থনীতির কি হাল হতে পারে, সেটা আর বিস্তারিত ব্যাখ্যার কিছু নেই।

Leave a Comment